জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে পড়েছেন রাজধানীর রাইড শেয়ারিং চালকরা। তেলের খরচ, মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশের দাম ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়লেও সে অনুপাতে আয় বাড়েনি বলে অভিযোগ তাঁদের। অন্যদিকে যাত্রীদের দাবি, আগের তুলনায় রাইডের ভাড়া বেড়েছে, কমেছে ছাড়ের পরিমাণও। ফলে চালক ও যাত্রী—উভয় পক্ষকেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে হচ্ছে।

রাজধানীর গুলিস্তান, মানিকনগর ও কুড়িলসহ কয়েকটি এলাকায় চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

চালকদের ভাষ্য, অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ৮৯-৯০ টাকা থাকার সময় রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলোতে যে ভাড়া পাওয়া যেত, বর্তমানে দাম ১৬৫ টাকা হলেও সেই অনুপাতে ভাড়া বাড়েনি। এর সঙ্গে যাত্রীদের ডিসকাউন্ট ও অ্যাপের কমিশন কেটে নেওয়ায় হাতে থাকা অর্থ দিয়ে জ্বালানি, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

গুলিস্তানে কথা হয় মোটরসাইকেলচালক আবু সিদ্দিকের সঙ্গে। রাইড শেয়ারিং করে পাঁচ সদস্যের পরিবারের খরচ চালান তিনি। তাঁর অভিযোগ, জ্বালানির দাম বাড়লেও অ্যাপে ভাড়া তেমন বাড়েনি।

আবু সিদ্দিক বলেন, “তেলের দাম ৯০ টাকা যখন ছিল, তখনও পাঠাওয়ে যে ভাড়া ছিল, এখন তেলের দাম ১৬৫ টাকা, তবুও সেই ভাড়াই আছে। এর ওপর যাত্রীদের ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। ফলে তেলের খরচ অনুযায়ী ন্যায্য ভাড়া পাই না।”

তিনি আরও বলেন, জ্বালানির পাশাপাশি মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে। নিয়মিত চালানোর কারণে প্রায় প্রতি মাসেই সার্ভিসিং করাতে হয়। এতে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। সবকিছুর দাম বাড়লেও চালকদের আয় সেই তুলনায় বাড়েনি।

নিজের একটি রাইডের হিসাব তুলে ধরে আবু সিদ্দিক বলেন, ধানমন্ডির একটি হাসপাতাল থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার যাত্রায় ভাড়া নির্ধারিত হয়েছিল ২৫০ টাকা। যাত্রী ১০০ টাকা ছাড় পাওয়ার পর অ্যাপের কমিশন বাবদ আরও ৩০ টাকা কেটে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে তিনি পান মাত্র ১২০ টাকা। তাঁর দাবি, এত দূর যানজট ঠেলে গিয়ে এই অর্থে জ্বালানির খরচও ঠিকমতো ওঠে না।

কম ভাড়ায় সংসার চালানো কঠিন

কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় যাত্রীর অপেক্ষায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় অনেক মোটরসাইকেলচালককে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর যাত্রী পাওয়া গেলেও ভাড়া নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে তাঁদের মধ্যে।

চালক কাওসার আহমেদ সাব্বির বলেন, রাইডের ভাড়া কম হওয়ায় অনেক সময় চালক ও যাত্রীর মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। যাত্রীরা অ্যাপে কম ভাড়া দেখানোর কথা বললেও চালকদের জ্বালানি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

তিনি জানান, একদিন সকালে কয়েকটি ট্রিপ করে মোট ৪৬৫ টাকা আয় করেছিলেন। সেখান থেকে জ্বালানি ও নিজের প্রয়োজনীয় খরচ বাবদ প্রায় ৩০০ টাকা চলে যায়। এরপর মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশের খরচও রয়েছে। সব ব্যয় মেটানোর পর হাতে তেমন কিছু থাকে না। পরদিন আবার ধার করে জ্বালানি নিয়ে রাস্তায় নামতে হয়।

একই এলাকার আরেক চালক গাজি জানান, কম ভাড়ার পাশাপাশি যাত্রীসংকটও তাঁদের আয় কমিয়ে দিচ্ছে। বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনো যাত্রী পাননি বলে জানান তিনি। ভাড়া কম হলে অনেক সময় রাইড নিতে চান না চালকেরা।

তবে অধিকাংশ চালক কিস্তিতে মোটরসাইকেল কেনায় তাঁদের নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। ফলে সংসারের খরচ সামলানোর পাশাপাশি কিস্তির চাপ থাকায় কম ভাড়ায়ও রাইড নিতে বাধ্য হন অনেকে।

যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে বিপাকে চালকরা

মানিকনগর এলাকায় কথা হয় হৃদয় নামের এক মোটরসাইকেলচালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের পাশাপাশি মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে। আগে যে যন্ত্রাংশ ৫০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটির দাম প্রায় এক হাজার টাকা। অথচ চালকদের আয় বাড়েনি।

ব্যয় সামাল দিতে না পেরে পরিবারকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে ঢাকায় একা থাকছেন জানিয়ে হৃদয় বলেন, “আগে বউ-বাচ্চা নিয়ে ঢাকায় থাকতাম। এখন খরচ চালাতে পারছি না। ওদের গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমি একা ঢাকায় থাকি।”

চালকদের অভিযোগ, অ্যাপের মাধ্যমে রাইড নেওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে ভাড়া ও ছাড়ের হিসাব পুরোপুরি স্পষ্ট থাকে না। যাত্রা শেষে দেখা যায়, যাত্রীকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অ্যাপের বাইরে সরাসরি যাত্রী পরিবহন করতে গেলে ভাড়া নিয়ে দীর্ঘ সময় দর-কষাকষি করতে হয়।

ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন চালক। তাঁদের দাবি, বাস রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলতে পারলেও মোটরসাইকেল দাঁড় করালে অনেক সময় জরিমানার মুখে পড়তে হয়। এক চালকের ভাষ্য, সামান্য নিয়মের ব্যত্যয়েও মামলা হলে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে যায়, যা তাঁদের দৈনিক আয়ের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

যাত্রীদের অভিযোগ, বেড়েছে ভাড়া ও কমেছে ছাড়

চালকদের অভিযোগের বিপরীতে যাত্রীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়াও কিছুটা বেড়েছে। একই সঙ্গে গত এক থেকে দেড় বছরে বিভিন্ন অ্যাপে ছাড়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

সজিব নামের এক যাত্রী বলেন, আগের তুলনায় ভাড়া কিছুটা বেড়েছে এবং পাঠাও ও উবারে ছাড়ের সুযোগ কমেছে। গত এক থেকে দেড় বছরে শতাধিক রাইড নেওয়ার পর মাত্র দুবার ১০ শতাংশ হারে ছাড় পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

মানিকনগরের বাসিন্দা সানজিদা আক্তারের অভিযোগ, কয়েকবার অ্যাপে দেখানো ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা দিতে হয়েছে তাঁকে। অ্যাপের বাইরে সরাসরি রাইড নিতে গেলেও জ্বালানির দাম বাড়ার কথা বলে অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া হয়।

তিনি বলেন, “যেখানে ভাড়া ১৫০ টাকা, সেখানে ৩০০ টাকারও বেশি চাওয়া হয়।”

সানজিদা জানান, ব্যক্তিগত আয় না বাড়লেও দৈনন্দিন ব্যয় বেড়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় যাতায়াতের ক্ষেত্রেও খরচ হিসাব করে চলতে হচ্ছে। তবে জরুরি প্রয়োজনে বেশি ভাড়া দিয়েও রাইড নিতে হয়।

পিক আওয়ারে বাড়ে ভাড়া

রাইড শেয়ারিং অ্যাপের ভাড়া নির্ধারণে ব্যস্ত সময় ও স্বাভাবিক সময়ের প্রভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীদের অনেকে। যানজট ও চাহিদার ওপর নির্ভর করেও ভাড়া পরিবর্তিত হয়।

আসাদুল নামের এক যাত্রী বলেন, পিক আওয়ার ও নন-পিক আওয়ারের ওপর ভাড়া কম-বেশি হয়। যানজটের কারণেও অনেক সময় অ্যাপে বেশি ভাড়া দেখানো হয়। তাঁর মতে, রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া কখনোই সব সময় নির্দিষ্ট থাকে না।

এ বিষয়ে জানতে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান পাঠাওয়ের জনসংযোগ ব্যবস্থাপক মো. ফয়েজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে চাননি। উবার বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড এস এম জামশেদ হাসানের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।

জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি, অ্যাপের কমিশন এবং ছাড়ের হিসাব নিয়ে চালক-যাত্রীদের এই মতপার্থক্য রাজধানীর রাইড শেয়ারিং খাতের চাপের চিত্র তুলে ধরছে। চালকেরা ন্যায্য আয়ের দাবি জানাচ্ছেন, আর যাত্রীরা চাইছেন স্বচ্ছ ভাড়া ও সাশ্রয়ী যাতায়াতের সুযোগ।