ঢাকার অভিজাত এলাকার বার, ক্লাব ও পাঁচতারা হোটেলে সম্প্রতি একের পর এক অভিযান চালিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। ৩ অক্টোবর গুলশান, উত্তরা ও তেজগাঁওয়ের চারটি প্রতিষ্ঠানে অভিযানের পর ১৩ অক্টোবর রাতে গুলশানের কয়েকটি বার ও হোটেলে অভিযান চালানো হয়। সর্বশেষ ১৬ অক্টোবর ভোরে গুলশান-২-এর ‘জার্মান ক্লাব’ নামে পরিচিত একটি ভেন্যুতে অভিযান চালিয়ে ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসব অভিযানে অনুমোদনহীন মদ জব্দ, লাইসেন্স যাচাই এবং কর-সংক্রান্ত নথিপত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে অভিযান পরিচালনার সময় ও পদ্ধতি নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি গ্রাহকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও বৈধ ব্যবসার পরিবেশ কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে?
দুই সপ্তাহে যেসব প্রতিষ্ঠানে অভিযান
৩ অক্টোবর এনবিআরের কাস্টমস গোয়েন্দা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গুলশানের ফু-ওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস, র ক্যানভাস বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, উত্তরার মার্গারিটা লাউঞ্জ এবং তেজগাঁওয়ের হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনালে অভিযান চালায়। এসব অভিযানে অনুমোদনহীন মদ জব্দ এবং লাইসেন্স ও নথিপত্র যাচাই করা হয়।
এরপর ১৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে গুলশানের হোটেল আমারি, কিংফিশার বার ও ব্লিজ আর্ট বারে অভিযান চালায় ডিএনসি। হোটেল আমারিতে পারমিট ছাড়া মদ্যপানরত সাতজনকে পাওয়া যায়। কিংফিশার বার থেকে কাগজপত্রবিহীন মদ উদ্ধারের কথা জানানো হয়। ব্লিজ আর্ট বার বন্ধ থাকায় সেখান থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়।
সর্বশেষ ১৬ অক্টোবর ভোরে ‘জার্মান ক্লাব’ নামে পরিচিত ভেন্যুতে অভিযান চালিয়ে বারের লাইসেন্স ছাড়া ২৪৪ লিটার বিদেশি মদ ও বিয়ার জব্দের কথা জানিয়েছে ডিএনসি। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টিকিটের বিনিময়ে ডিজে পার্টি আয়োজনের অভিযোগেও তদন্ত চলছে।
গ্রাহকের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ
ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, গভীর রাতে গ্রাহক উপস্থিত থাকা অবস্থায় অভিযান চালালে সেখানে থাকা ব্যক্তিদের ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হতে পারে। পরে এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাঁদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সাম্প্রতিক একটি অভিযানের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেনএমন এক ব্যবসায়ী দুরবীন নিউজকে জানান, অভিযান শুরু হলে ভেতরে থাকা নারী-পুরুষ গ্রাহকদের এক জায়গায় জড়ো করা হয়। এ সময় ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরিচয় প্রকাশ করলে ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কায় তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি।
নাইটলাইফ ও বিনিয়োগের সম্পর্ক
গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় বিদেশি কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, পোশাকশিল্পের ক্রেতা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মীদের যাতায়াত রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এসব এলাকার বৈধ বিনোদন ও আতিথেয়তা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি অতিথিদের সেবা দেওয়ার পাশাপাশি শহরের ব্যবসায়িক পরিবেশের সঙ্গেও যুক্ত।
তাঁদের আশঙ্কা, অভিযানকালে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে বিদেশি অতিথিদের পরিচয় প্রকাশ পেলে তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সুনামেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানে মদ বিক্রি, শুল্ক-কর ফাঁকি কিংবা পারমিটের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ যাচাই করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ফলে বিষয়টি শুধু অভিযান চালানো বা না চালানোর নয়; বরং আইন প্রয়োগের সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও বৈধ ব্যবসার স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করার প্রশ্নও সামনে এসেছে।
দিনের বেলায় অভিযান, নাকি রাতেই প্রয়োজন?
ব্যবসায়ীদের একাংশের প্রস্তাব, মজুত, লাইসেন্স, আমদানি-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং কর-ভ্যাটের হিসাব যাচাইয়ের মতো কাজ প্রতিষ্ঠান খোলার আগে দিনের বেলায় করা যেতে পারে। এতে গ্রাহকদের উপস্থিতিতে অভিযান চালানোর প্রয়োজন কমবে বলে তাঁদের ধারণা।
তবে সব অনিয়ম দিনের বেলায় শনাক্ত করা সম্ভব নয়। পারমিট ছাড়া মদ পরিবেশন করা হচ্ছে কি না, কিংবা লাইসেন্সবিহীন কোনো ভেন্যুতে পার্টি চলছে কি না—এসব যাচাইয়ে প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান চালু থাকা অবস্থায় অভিযান দরকার হতে পারে।
এ কারণে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অভিযানের জন্য স্পষ্ট নীতিমালা বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রণয়নের প্রস্তাব এসেছে। তাঁদের মতে, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান, গ্রাহকদের পরিচয় ও ছবি-ভিডিওর গোপনীয়তা রক্ষা এবং বৈধ গ্রাহকদের দ্রুত যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকলে আইন প্রয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশ দুটিই সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
আইন প্রয়োগের সঙ্গে গোপনীয়তার সুরক্ষা
ডিএনসি জানিয়েছে, লাইসেন্সের শর্ত প্রতিপালন নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান চলবে। অন্যদিকে এনবিআর ৩ অক্টোবরের অভিযানকে তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ বলে উল্লেখ করেছে।
অবৈধ মদ, শুল্ক ফাঁকি ও লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও অভিযানের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ নীতিমালা থাকলে সংশ্লিষ্ট সবার উদ্বেগ কমতে পারে।
ঢাকায় বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন বাড়ানোর লক্ষ্য পূরণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিরাপদ ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযানের কার্যকারিতা বজায় রেখে গ্রাহকের মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং বৈধ প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার উপায় নির্ধারণ করাই এখন মূল আলোচ্য বিষয়।









