‘ছাত্রদলের নতুন কমিটি চূড়ান্ত, যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে’—গত কয়েক মাস ধরে এমন আলোচনা চললেও এখনো ঘোষণা করা হয়নি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি। পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের অপেক্ষার মধ্যে নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের নানা হিসাব-নিকাশ চলছে।

সংগঠনের শীর্ষ পদে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব দেওয়া হবে, নাকি বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে—এই প্রশ্নেই মূলত সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে দায়িত্বশীল নেতাদের দাবি, রাজপথের অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রেখে শিগগিরই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর।

এদিকে কমিটি ঘোষণায় বিলম্বের কারণে সংগঠনের কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সাবেক ও বর্তমান নেতাদের অনেকে। গত ১৪ আগস্ট ছাত্রদলের শীর্ষ পাঁচ নেতা বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। এরপর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় সংগঠনের ভেতরে নানা আলোচনা চলছে। বিদায়ী নেতাদের সাংগঠনিক কর্তৃত্বও আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

ছাত্রদলের সাবেক এক শীর্ষ নেতার ভাষ্য, কমিটি ঘোষণায় বিলম্বের কারণে সংগঠনের ক্ষতি হচ্ছে। বিদায়ী নেতারা কর্মীদের কাছে ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারাচ্ছেন। বিষয়টি দলের নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ও নেতৃত্বের সেশনজট

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১ মার্চ। শুধু কেন্দ্রীয় কমিটিই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন জেলা ইউনিটের অনেক কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে। ফলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি সংগঠনের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নতুন নেতৃত্বের দৌড়ে থাকা পদপ্রত্যাশীদের শিক্ষাবর্ষ ও বয়স নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তাঁদের বড় একটি অংশের শিক্ষাবর্ষ ২০০৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে। ফলে অনেকের প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রত্ব বহু আগেই শেষ হয়েছে। তাঁদের গড় বয়স প্রায় ৩৫ বছর বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।

পদপ্রত্যাশীদের দাবি, বিগত সরকারের সময়ে হামলা, মামলা, কারাবরণ ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে অনেকের পড়াশোনা স্বাভাবিক গতিতে এগোয়নি। ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি ছাত্রত্ব বজায় রাখতে তাঁদের কেউ কেউ সান্ধ্যকালীন কোর্স, পেশাগত ডিপ্লোমা কিংবা উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন। বয়স ও ছাত্রত্বের এই জটিল সমীকরণ নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে অন্যতম বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

বিদায়ী সাক্ষাতের পরও অপেক্ষা

২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে একই বছরের ১৫ জুন ২৬০ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

বর্তমান কমিটির মেয়াদকালে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ছাত্রদল রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আন্দোলনেও সংগঠনটির নেতাকর্মীরা অংশ নেন। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন স্থানে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সংগঠনটি সমালোচনার মুখেও পড়ে।

নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গত ১৪ আগস্ট সংগঠনের শীর্ষ পাঁচ নেতা বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য নিজেদের পছন্দের তালিকাও গোপন ব্যালটে জমা দেন তাঁরা। এরপর থেকেই নতুন কমিটি ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন পদপ্রত্যাশী ও সাধারণ নেতাকর্মীরা।

হাইকমান্ডের নতুন সমীকরণ ও তরুণ নেতৃত্ব

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রগুলোর ভাষ্য, ছাত্রদলে নিয়মতান্ত্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান তারেক রহমান। কমিটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে সংগঠনে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ছাত্ররাজনীতিতে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম, মেধাবী ও নিয়মিত শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ও জেন-জি প্রজন্মের চিন্তাভাবনা বোঝেন, এমন নেতাদের সামনে আনার পক্ষে মত রয়েছে।

অন্যদিকে দলের একাংশ মনে করছে, একটি বড় জাতীয় ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব দিতে শুধু ছাত্রত্ব থাকাই যথেষ্ট নয়। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সমন্বয় করেই নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই

নতুন কমিটি গঠনে বিলম্বের আরেকটি কারণ হিসেবে পদপ্রত্যাশীদের অতীত কর্মকাণ্ড যাচাইয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় পদে আগ্রহী নেতাদের রাজনৈতিক ভূমিকা, ছাত্রত্বের বৈধতা এবং অন্য কোনো ছাত্রসংগঠন বা বিতর্কিত গোষ্ঠীর সঙ্গে অতীত কিংবা বর্তমান সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দলীয় প্রধানের নির্দেশনায় এ প্রক্রিয়া সমন্বয় করছেন বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা এবং গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুস সাত্তার পাটোয়ারী। পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যমে পদপ্রত্যাশীদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন জানিয়েছেন, নতুন কমিটি গঠনের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। যেকোনো সময় নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।

সাংগঠনিক স্থবিরতা নিয়ে উদ্বেগ

নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে বিলম্বের প্রভাব পড়ছে মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও। বিভিন্ন ক্যাম্পাস ও গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে বিদায়ী নেতৃত্বকে বেগ পেতে হচ্ছে বলে নেতাকর্মীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন।

শীর্ষ পদপ্রত্যাশী এক নেতা বলেন, কারা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, কারা হামলা-মামলা ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন এবং কার সাংগঠনিক দক্ষতা কেমন—এসব তথ্য দলের নীতিনির্ধারকদের জানা রয়েছে। তাই যোগ্যদের হাতে দ্রুত নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার প্রত্যাশা তাঁদের।

তবে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের দাবি, কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া কোথাও আটকে নেই। যাচাই-বাছাইয়ের জন্য যৌক্তিক যে সময় প্রয়োজন, তার মধ্যেই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে বলে তিনি আশা করছেন।

নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক দক্ষতা, আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগ এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি। দায়িত্বশীলরা এসব বিষয় যাচাই করে শিগগিরই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সব মিলিয়ে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার অপেক্ষা দীর্ঘ হলেও নেতৃত্ব নির্বাচনে ছাত্রত্ব, বয়স, রাজনৈতিক ত্যাগ ও সাংগঠনিক দক্ষতার মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীরা।