রংপুর প্রতিনিধি:

রংপুর সদর উপজেলার শ্যামপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো. কাজল মাহমুদের শিক্ষাগত সনদ ও পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যের নাম ও শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিষয়টি তদন্ত করছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), রংপুর অঞ্চল।


citytouch 728-X-90

অভিযোগ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ‘কাজল মাহমুদ’ ও ‘রাফসান মাহমুদ’ নামে দুই ব্যক্তির শিক্ষাগত নথিতে একাধিক তথ্যের মিল পাওয়া গেছে। দুজনের এসএসসি পরীক্ষার রোল নম্বর ২৪৬, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৭৬০৫৮ এবং সেশন ১৯৮৭-৮৮। এইচএসসি পরীক্ষার রোল নম্বরও দুজনের ২৮৫৬৯। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুজনের জন্মতারিখও একই ৩১ মার্চ ১৯৭৪।


তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার খেপুপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৯ সালে ‘কাজল মাহমুদ’ নামে একজন এসএসসি পাস করেন। পরে ১৯৯১ সালে ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।


পরবর্তী সময়ে এসব শিক্ষাগত সনদে নাম ও বাবার নাম পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ২০০২ সালে সনদ সংশোধনের পর ‘কাজল মাহমুদ’ ও ‘ছোবাহান মাস্টার’-এর পরিবর্তে ‘রাফসান মাহমুদ’ ও ‘আব্দুস ছোবহান’ নাম ব্যবহারের তথ্য রয়েছে। পরে জাতীয় পরিচয়পত্রেও রাফসান মাহমুদ নাম ও আব্দুস ছোবহানকে বাবার নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।


এদিকে, শ্যামপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ কাজল মাহমুদের শিক্ষাগত নথিতেও একই এসএসসি রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও সেশন পাওয়া গেছে। একইভাবে এইচএসসির রোল এবং জন্মতারিখেও মিল রয়েছে। বিষয়টি নিয়েই তদন্ত করছে মাউশি।


তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অধ্যক্ষ কাজল মাহমুদের পারিবারিক বাড়ি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নে। তবে তাঁর শিক্ষাগত নথিতে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার খেপুপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের তথ্য রয়েছে। তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য নথিতেও পরিচয়সংক্রান্ত কিছু তথ্যের পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।


নথি অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের ৪ ডিসেম্বর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ মহিলা কলেজে ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে চাকরি শুরু করেন কাজল মাহমুদ। ২০০০ সালের মে মাসে তিনি এমপিওভুক্ত হন। ২০১৪ সালের আগস্টে কাউনিয়া মহিলা কলেজে উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। সেখানে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর শ্যামপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন তিনি।


অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ মো. কাজল মাহমুদ। তাঁর দাবি, তাঁর শিক্ষাগত সনদ সঠিক এবং ‘রাফসান মাহমুদ’ তাঁর সনদ জালিয়াতি করে নিজের বলে দাবি করছেন।


কাজল মাহমুদ বলেন, দীর্ঘ ২৬ বছরের চাকরিজীবনে তাঁর প্রতিষ্ঠানে একাধিক মন্ত্রণালয়ের অডিট হয়েছে। এসব অডিটে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা বা চাকরি নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। বিষয়টি ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে করা অপপ্রচার বলেও দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় রাফসান মাহমুদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।


মাউশি রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক (কলেজ) কামরুজ্জামান পাইকার বলেন, বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অধ্যক্ষের শিক্ষাগত সনদ ও চাকরিসংক্রান্ত নথি যাচাই করা হচ্ছে।


তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। অধ্যক্ষের কাছে কয়েকটি সনদ পাওয়া গেলেও মার্কশিট, প্রবেশপত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ডসহ কিছু নথি পাওয়া যায়নি। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে এখনই সনদ জালিয়াতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।


মাউশির এই কর্মকর্তা আরও জানান, রাফসান মাহমুদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তিনি তাঁর একাডেমিক সনদ জালিয়াতি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি যাচাই করে তদন্ত শেষ করা হবে। এরপর পাওয়া তথ্য ও অফিসিয়াল নথির ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


এদিকে, শ্যামপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, কুড়িগ্রামের বাসিন্দা হয়ে পটুয়াখালী থেকে এসএসসি পাস করার বিষয়টি তাঁর কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না বলে জানান তিনি।


তদন্তে এখন মূলত দুই ব্যক্তির শিক্ষাগত নথিতে একই রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর কীভাবে এসেছে, সনদ সংশোধনের প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়েছিল এবং চাকরির সময় জমা দেওয়া নথিগুলো কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য সরকারি নথি যাচাই শেষে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে।