রংপুর প্রতিনিধি:

নিজের তৈরি ছোট্ট বিমান যখন আকাশে ডানা মেলে, তখন আনন্দে ভরে ওঠে কিশোর সামিউল ইসলামের মন। হাতে রিমোট কন্ট্রোল, চোখ আকাশে—সেই নিয়ন্ত্রণেই কখনো ওপরে, কখনো নিচে, আবার কখনো এঁকেবেঁকে উড়ে বেড়ায় তার তৈরি বিমান। ব্যতিক্রমী এই দৃশ্য দেখতে ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ।

কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ কিংবা আধুনিক গবেষণাগারের সুযোগ ছাড়াই ইউটিউব দেখে নিজের চেষ্টায় রিমোট কন্ট্রোল বিমান তৈরি করেছে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিউল ইসলাম। তার এই সাফল্য ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে কৌতূহল ও উৎসাহ।

citytouch 728-X-90

সামিউল মিঠাপুকুর উপজেলার বড় হজরতপুর ইউনিয়নের রামেশ্বরপাড়া এলাকার বাসিন্দা। সে শঠিবাড়ি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই আকাশে বিমান দেখলে তার মনে নানা প্রশ্ন জাগত। কীভাবে বিমান আকাশে ওড়ে, কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়—এসব জানার আগ্রহ থেকেই ইউটিউবে বিমান তৈরির ভিডিও দেখা শুরু করে সে।

একসময় ভিডিও দেখে শেখা বিষয়গুলো বাস্তবে প্রয়োগের উদ্যোগ নেয় সামিউল। প্রায় এক মাসের নিরলস চেষ্টায় তৈরি করে ৫৪ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটি রিমোট কন্ট্রোল বিমান। এতে ব্যবহার করেছে ২২০০ কেভির মোটর। তার দাবি, বিমানটি প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে।

তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা। বিমান তৈরিতে সামিউলের খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। প্রথমে স্কুলের টিফিনের টাকা জমিয়ে কাজ শুরু করে সে। পরে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কিনতে বাবা ও চাচাদের কাছ থেকেও আর্থিক সহায়তা নেয়।

শুরুতে পরিবারের সবাই তার এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে নেননি। পড়াশোনার ক্ষতি ও সময় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে। কিন্তু নিজের আগ্রহ আর স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস থেকে পিছিয়ে যায়নি সামিউল। অবশেষে নিজের হাতে তৈরি বিমান আকাশে উড়িয়ে সফলতার স্বাদ পায় সে।

ছোট বিমানে বড় স্বপ্ন

সামিউলের তৈরি বিমানটি এখনো কোনো কিছু বহন করতে পারে না। কিন্তু তার স্বপ্নের পরিধি অনেক বড়। ভবিষ্যতে বিমান প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করে এমন বিমান তৈরির কাজে যুক্ত হতে চায়, যা মানুষের কাজে লাগবে। একদিন মানুষ বহনে সক্ষম জেট বিমান তৈরির স্বপ্নও দেখে এই কিশোর।

সামিউলের সহপাঠী রবিউল ইসলাম জানায়, সামিউলের এমন সাফল্যে তারা গর্বিত। অল্প সময়ের মধ্যে নিজের চেষ্টায় বিমান তৈরি করা সহজ বিষয় নয়। তার মতে, যথাযথ সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে সামিউল ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু করতে পারবে।

ছেলের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত মা আমেনা বেগমও। তিনি বলেন, “আমার ছেলে বিমান তৈরি করেছে, এতে আমি খুব খুশি। আমি চাই, সে ভবিষ্যতে বিমান তৈরির কাজ করুক। সরকার যদি তার দিকে একটু নজর দেয় এবং সহযোগিতা করে, তাহলে ছেলেটি নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবে।”

সামিউলের প্রতিভায় মুগ্ধ তার শিক্ষক আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, সামিউল শান্ত স্বভাবের শিক্ষার্থী। তার মধ্যে যে এমন প্রতিভা রয়েছে, তা বিমান তৈরি ও উড়ানোর পর আরও ভালোভাবে বোঝা গেছে। এ ধরনের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

প্রতিভা বিকাশে প্রয়োজন সুযোগ

প্রত্যন্ত গ্রামের একটি সাধারণ পরিবারের সন্তান সামিউল। নেই নিজস্ব গবেষণাগার, নেই উন্নত প্রযুক্তির পর্যাপ্ত সুবিধা। তারপরও ইন্টারনেটের সহায়তায় শেখার চেষ্টা এবং নিজের হাতে কাজ করার আগ্রহ তাকে পৌঁছে দিয়েছে এক নতুন অভিজ্ঞতায়।

তার তৈরি বিমান দেখতে প্রতিদিনই স্থানীয়দের আগ্রহ বাড়ছে। তবে শুধু প্রশংসা নয়, সামিউলের প্রয়োজন কারিগরি শিক্ষা, অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের দিকনির্দেশনা এবং বিজ্ঞানচর্চার উপযুক্ত পরিবেশ। এসব সুযোগ পেলে তার আগ্রহকে আরও দক্ষতায় রূপ দেওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।

সামিউলের এই উদ্যোগ প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ তৈরির একটি উদাহরণ। এখন তার প্রত্যাশা, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিমান প্রকৌশল সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে সে। আর পরিবারের আশা, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে একদিন নিজের স্বপ্নকে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নিতে পারবে এই কিশোর।