দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাঁচ তরুণী। তাঁদের কেউ চা-শ্রমিকের সন্তান, কেউ কৃষক পরিবারের মেয়ে, আবার কেউ বাবাকে হারিয়ে মায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনায় নানা বাধা এলেও তাঁরা হাল ছাড়েননি। তাঁদের উচ্চশিক্ষার পথ সহজ করতে সহায়তা করছে ‘অদ্বিতীয়া’ বৃত্তি।
আইডিএলসি ও একটি ট্রাস্টের উদ্যোগে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের শিক্ষার্থীদের এই বৃত্তি দেওয়া হয়। দরিদ্র পরিবারের প্রথম মেয়েসন্তান, যাঁরা নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পৌঁছেছেন, তাঁদের অনুপ্রাণিত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
বৃত্তির আওতায় শিক্ষার্থীরা আবাসন, টিউশন ফি মওকুফসহ বিভিন্ন সুবিধা পান। এ পর্যন্ত মোট ১৪৩ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৮৬ জন স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। অনেকেই দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে রয়েছেন। নতুন করে এ বছর বৃত্তি পেয়েছেন ১৫ জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচ শিক্ষার্থীর সংগ্রামের গল্প উঠে এসেছে।
ইউটিউব দেখে পড়ালেখা করে জিপিএ–৫: অন্তরা তাঁতী
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট চা-বাগানের একটি ছোট ঘরে জন্ম অন্তরা তাঁতীর। তাঁর বাবা একজন চা-শ্রমিক। প্রতিদিনের মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। সংসারে অভাব থাকলেও মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখতেন তাঁর বাবা।
অভাবের কারণে স্কুলজীবনে গাইড বই কিনতে পারেননি অন্তরা। বন্ধুদের কাছ থেকে বই ধার করে পড়াশোনা করেছেন। এভাবেই ২০২২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। একাদশ শ্রেণিতে ওঠার পর কোচিং করার সামর্থ্য ছিল না। বন্ধুদের নোট সংগ্রহ করে পড়াশোনা চালিয়ে যান। বাসায় স্মার্টফোন না থাকায় মাঝেমধ্যে চাচাতো ভাইয়ের ফোনে ইউটিউব দেখে ক্লাস করতেন। পরে এইচএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ পান।
বর্তমানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পড়াশোনা করছেন অন্তরা। তবে যাতায়াত, বই-খাতা ও অন্যান্য খরচ চালানো তাঁর পরিবারের জন্য কঠিন। তাঁর দুই ছোট বোনের পড়াশোনার ব্যয়ও বাবাকে বহন করতে হয়। অদ্বিতীয়া বৃত্তি তাঁর পড়াশোনার পথ সহজ করার পাশাপাশি বাবার আর্থিক চাপ কমাবে বলে আশা করছেন তিনি।
কখনো পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবিনি: অনিমা রানী পাল
মৌলভীবাজারের অনিমা রানী পালের বাবা একজন কৃষক এবং মা চা-শ্রমিক। চার বোনের মধ্যে বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট দুই বোনের একজন অষ্টম শ্রেণিতে এবং অন্যজন প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। দাদু-ঠাকুমাসহ পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের দায়িত্বও মা-বাবার ওপর।
বাবার কৃষিকাজের অনিশ্চিত আয় এবং মায়ের সামান্য মজুরিতে সংসার চালাতে হয়। এর মধ্যে তিন মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগানো তাঁদের জন্য বেশ কঠিন।
অভাব-অনটন কাছ থেকে দেখলেও কখনো পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবেননি অনিমা। বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে পড়াশোনা করায় প্রতি মাসে বাড়ি থেকে টাকা পাঠাতে হয়। এতে মা-বাবাকে আর্থিক চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অদ্বিতীয়া বৃত্তি তাঁদের কষ্ট কিছুটা কমাবে বলে আশা করছেন তিনি। ভবিষ্যতে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতে চান অনিমা।
স্কুলের পোশাক কিনতে মানুষের জুমে কাজ করেছি: লিডিয়া বম
বান্দরবানের লিডিয়া বমের জন্ম একটি ছোট মাচাং ঘরে। তাঁর মা-বাবা দুজনই জুমচাষি। পরিবারের খাবারের জোগান দিতে তাঁদের অন্যের জুমেও কাজ করতে হয়। কখনো মাসে সাত হাজার টাকা আয় হতো, আবার কখনো এর অর্ধেকেরও কম। এমন দিনও গেছে, যখন ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত কাটাতে হয়েছে।
স্কুলের পোশাক কেনার টাকা না থাকায় অন্যের জুমে কাজ করেছেন লিডিয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার খরচ জোগাতে তাঁর বাবা পরিচিত একজনের কাছ থেকে টাকা ধার করেছিলেন। তবে ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ না পাওয়ায় ঋণের টাকা শোধ করতে ঢাকায় গিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি।
সেখানেই এক বড় বোনের কাছ থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বৃত্তির বিষয়ে জানতে পারেন। আবেদন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান।
বর্তমানে তাঁর ছোট বোন নার্সিং কলেজে পড়ছেন। তাঁর পড়াশোনার খরচ চালাতেও মা-বাবাকে বেশ কষ্ট করতে হয়। অদ্বিতীয়া বৃত্তি পেলে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক চাপ কমাতে পারবেন বলে আশা লিডিয়ার।
বাবাকে হারিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা: মেহেরুন নেছা
খাগড়াছড়ির মেহেরুন নেছা বর্তমানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে ‘প্রি-আন্ডারগ্র্যাড পাথওয়ে’ কোর্সে পড়ছেন। তাঁদের পরিবারে মা, ছোট ভাই ও তিনি—এই তিনজন সদস্য।
কিডনি রোগে বাবাকে হারানোর পর থেকেই পরিবারের দায়িত্ব পড়ে মায়ের ওপর। তাঁর মা গৃহিণী। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা মা মাঝেমধ্যে বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করে কিছু টাকা আয় করেন। তাঁর ছোট ভাই নবম শ্রেণিতে পড়ে।
পরিবারের নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে নিজের পড়াশোনা ও অন্যান্য খরচ নিজেই চালানোর চেষ্টা করেছেন মেহেরুন। কিন্তু পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাঁর মাকে হিমশিম খেতে হয়। এর সঙ্গে ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচও বহন করতে হচ্ছে।
অদ্বিতীয়া বৃত্তি পাওয়ায় তাঁর হাতখরচের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমেছে। আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা থেমে যাক, তা চান না মেহেরুন। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে একদিন পরিবারের দায়িত্ব নিতে চান তিনি।
মায়ের ত্যাগের মূল্য দিতে চাই: মিকল ময় ম্রো
বান্দরবানের মিকল ময় ম্রো ছোট থাকতেই তাঁর মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়। এরপর মা একাই তিন ভাই-বোনকে বড় করেছেন। সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে নিজের অনেক স্বপ্ন ও আরাম ত্যাগ করেছেন তিনি।
পরিবারটির নিজেদের কোনো বাড়ি নেই। দীর্ঘদিন মামার বাড়িতে থেকেছেন তাঁরা। সংসার চালাতে কখনো মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার করেছেন মিকলের মা, আবার কখনো মজুরিভিত্তিক কাজ করে সন্তানদের বই-খাতা ও স্কুলের খরচ জুগিয়েছেন। টাকার অভাবে মিকলের মেজ ভাই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। পরে নিজে কাজ করে ভাই-বোনদের পড়াশোনায় সহায়তা করেছেন।
এইচএসসি পাসের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখেন মিকল। প্রথমবার এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের ভর্তি পরীক্ষায় নির্বাচিত না হলেও হাল ছাড়েননি। দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বৃত্তিসহ পড়ার সুযোগ পান।
ভবিষ্যতে নিজের মতো আর্থিক সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান মিকল। মায়ের ত্যাগের মূল্য দিতে পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোই এখন তাঁর লক্ষ্য।








