আগামী শিক্ষাবর্ষের (২০২৭) পঞ্চম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জীবনী। তাঁদের পাশাপাশি আগের চার নেতা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীও থাকছে।

নতুন সংস্করণে শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসংক্রান্ত বর্ণনায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বইয়ে বলা হয়েছে, অপারেশন সার্চলাইট শুরুর পর তিনি ‘উই রিভোল্ট’ বলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পরে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। প্রথমে নিজের নামে ঘোষণা দিলেও পরবর্তী ঘোষণায় ‘শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে’ বাক্যটি যুক্ত করেন তিনি।

পঞ্চম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যয়নের বিষয়বস্তু পর্যালোচনায় এসব পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ অধ্যায়ের নাম ছিল ‘আমাদের স্মরণীয় নেতা’। নতুন সংস্করণে এর নাম করা হয়েছে ‘স্মরণীয় বরণীয় যারা’। বইটিতে আগের মতোই মোট ১৬টি অধ্যায় থাকছে।

শেখ মুজিবের জীবনীতে পরিবর্তন

২০২৭ সালের বইয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম স্থপতি’ হিসেবে। তাঁর জন্মস্থান হিসেবে ফরিদপুর জেলার তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ার উল্লেখ রয়েছে।

নতুন সংস্করণে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে ভর্তি হওয়ার তথ্য নির্দিষ্ট সালসহ তুলে ধরা হয়েছে। পাকিস্তান সরকারের শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পাশাপাশি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবির ক্ষেত্রে ‘স্বায়ত্তশাসন আদায়ের লক্ষ্যে’ কথাটি যোগ করা হয়েছে।

তবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের বিবরণে। ২০২৬ সালের বইয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি এবং পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়ার তথ্য ছিল। নতুন সংস্করণে মুক্তির তথ্য রাখা হলেও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি পাওয়ার বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর সরকার গঠনের প্রসঙ্গে আগের বইয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন ঠেকানোর ষড়যন্ত্রের কথা বলা হয়েছিল। নতুন সংস্করণে বিষয়টি আরও নির্দিষ্ট করে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে না দেওয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১৯৭১ সালে তাঁকে ঢাকায় আটক করে পাকিস্তানে বন্দি রাখা এবং ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরার তথ্য যুক্ত হয়েছে। তবে তাঁর শিক্ষাজীবন, ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীন বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দুই সংস্করণেই রয়েছে।

জিয়াউর রহমানের জীবনীতে যা আছে

নতুন বইয়ে জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান ও রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে। তাঁর বাবা মনসুর রহমান ও মা জাহানারা খাতুন।

জীবনীতে বলা হয়েছে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তাঁর পরিবার করাচিতে চলে যায়। ১৯৫২ সালে করাচি একাডেমি স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৫৫ সালে সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা তুলে ধরে বইয়ে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর জিয়াউর রহমান ‘উই রিভোল্ট’ বলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে পুনরায় ঘোষণা দেন। প্রথমে নিজের নামে ঘোষণা দিলেও পরবর্তী ঘোষণায় ‘শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে’ কথাটি যুক্ত করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। পরে মুক্তিবাহিনীর প্রথম সশস্ত্র ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ গঠন ও পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য তাঁকে ‘বীর উত্তম’ উপাধি দেওয়া হয়।

জীবনীতে আরও রয়েছে, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পর তিনি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহুদলীয় গণতন্ত্র, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন, সার্ক প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা, ১৯ দফা কর্মসূচি ও খাল খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল সেনাসদস্যের হাতে নিহত হওয়ার তথ্যও জীবনীতে রয়েছে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ও অবদান

নতুন সংস্করণে খালেদা জিয়ার জীবনীতে তাঁর জন্ম, শিক্ষাজীবন, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিবরণ রয়েছে। তাঁর প্রকৃত নাম খালেদা খানম পুতুল। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬০ সালে দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। একই বছর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগ দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালে দলটির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। জীবনীতে তাঁকে বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর প্রথমবার, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দ্বিতীয়বার এবং ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার তথ্যও রয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন প্রণয়নের কথা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও যমুনা বহুমুখী সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর বিষয়টিও রয়েছে।

জীবনীর শেষাংশে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়া, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট মুক্তি এবং ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে নতুন বর্ণনা

২০২৭ সালের বইয়ের ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, অপারেশন সার্চলাইট শুরুর পর চট্টগ্রামে তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ‘উই রিভোল্ট’ বলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এরপর ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। প্রথমে নিজের নামে ঘোষণা দিলেও পরবর্তী ঘোষণায় ‘শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে’ কথাটি যুক্ত করেন।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের বইয়ে বলা হয়েছিল, ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ২৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও ঘোষণা দেন। নতুন সংস্করণে বিদ্রোহ ঘোষণার ঘটনাও যুক্ত হয়েছে এবং ঘোষণার বিবরণে পরিবর্তন এসেছে।

যেভাবে পরিমার্জন হলো পাঠ্যবই

এনসিটিবির গবেষণা কর্মকর্তা মো. হাসানুজ্জামান জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের (আইইআর) চার শিক্ষক পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ সমন্বয় করেন। ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে কর্মশালার মাধ্যমে বই পরিমার্জন করা হয়।

তিনি জানান, ইতিহাসের বর্ণনায় ভুল, অস্পষ্টতা ও প্রয়োজনীয় সংশোধন চিহ্নিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বয়স উপযোগী করে বিষয়বস্তু সহজ ও স্পষ্ট করার নির্দেশনা ছিল। ছবি ও মানচিত্রও পর্যালোচনা করা হয়েছে।

হাসানুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের স্মরণীয় নেতা’ শিরোনাম পরিবর্তন করে ‘স্মরণীয়-বরণীয় যারা’ করা হয়েছে। আগের চার নেতার সঙ্গে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জীবনী যুক্ত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্বাধীনতার ঘোষণাসংক্রান্ত পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। এ জন্য অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটিও কাজ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন অধ্যাপক এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাসিরসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ওই কমিটিতে ছিলেন।

তিনি আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের পক্ষ থেকেও কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়। উচ্চপর্যায়ের কমিটির পর্যালোচনার ভিত্তিতে বইয়ের ইতিহাসসংক্রান্ত বর্ণনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচয়ে ‘স্বাধীনতার অন্যতম স্থপতি’ শব্দবন্ধ যুক্ত করার বিষয়ে হাসানুজ্জামান বলেন, এনসিটিবি থেকে সরাসরি শব্দটি যোগ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞ প্যানেল নাকি অন্য কোনো টিম পরিবর্তনটি করেছে, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।