সাইবেরিয়ার একটি প্লেগ গবেষণা কেন্দ্রে এক ল্যাবরেটরি কর্মীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিরল সংক্রামক রোগ প্লেগ। রাশিয়ার ইরকুটস্ক অঞ্চলে ওই কর্মীর মৃত্যুর পর সম্ভাব্য সংক্রমণ, কোয়ারেন্টাইন এবং গবেষণাগার থেকে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে নানা দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এসব দাবির অনেকগুলোই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
২৮ বছর বয়সী দারিয়া শিপিলোভা সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যের প্লেগ-প্রতিরোধী একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অসুস্থ হয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েক দিন পর ইরকুটস্কের কাছের শেলেখভ শহরে তার মৃত্যু হয়।
তার মৃত্যুর পর হাসপাতালটিতে কোয়ারেন্টাইন, স্থানীয় একটি কারখানায় মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশ এবং একটি গণসমাবেশ বাতিলের মতো বিভিন্ন পদক্ষেপের খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে এসব পদক্ষেপের সবগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
একপর্যায়ে স্থানীয় কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে প্লেগে মৃত্যুর কথা বলা হলেও পরে রাশিয়ার জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই ল্যাবকর্মীর মৃত্যুর সঙ্গে প্লেগের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। কর্তৃপক্ষের দাবি, তিনি অজ্ঞাত কারণে সৃষ্ট নিউমোনিয়ায় মারা গেছেন এবং পরীক্ষায় তার পেশাগত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো অণুজীব শনাক্ত হয়নি।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের গুজবও ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ দাবি করেন, গবেষণাগারে দুর্ঘটনার পর প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছে। আবার কারও দাবি, আরও একজন ল্যাবকর্মী মারা গেছেন। এসব দাবির কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
প্লেগ কী?
প্লেগ একটি সংক্রামক রোগ, যার জন্য দায়ী ‘ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস’ নামের ব্যাকটেরিয়া। মধ্যযুগে ইউরোপে ভয়াবহ মহামারি সৃষ্টি করা ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর জন্যও এই জীবাণুই দায়ী ছিল। ওই মহামারিতে ইউরোপের বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যায়।
বর্তমানে প্লেগ অত্যন্ত বিরল হলেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর জীবাণু প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে কিছু বন্য ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মধ্যে এই জীবাণুর উপস্থিতি দেখা যায়।
সাধারণত সংক্রমিত প্রাণীর শরীরে থাকা মাছির কামড়ের মাধ্যমে মানুষ প্লেগে আক্রান্ত হতে পারে। এ ছাড়া আক্রান্ত প্রাণী বা মানুষের শারীরিক তরল কিংবা দূষিত বস্তু সরাসরি সংস্পর্শে এলেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। নিউমোনিক প্লেগের ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে নির্গত কণার সংস্পর্শেও অন্য ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন।
নিউমোনিক প্লেগ কেন বেশি ভয়ংকর
প্লেগের কয়েকটি ধরন রয়েছে। এর মধ্যে নিউমোনিক প্লেগ সবচেয়ে গুরুতর। এ ধরনের সংক্রমণে ফুসফুস আক্রান্ত হয় এবং রোগটি দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে।
সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে জ্বর, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট ও কাশি। কখনো কাশির সঙ্গে রক্তও আসতে পারে। নিউমোনিক প্লেগের ক্ষেত্রে সংক্রমণের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তবে দ্রুত শনাক্ত করে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা শুরু করা গেলে প্লেগের চিকিৎসা সম্ভব। চিকিৎসা না করা হলে রোগটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
মহামারির আশঙ্কা কতটা
সাইবেরিয়ায় ল্যাবকর্মীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ তৈরি হলেও প্লেগের নতুন কোনো বৈশ্বিক মহামারির আশঙ্কা এখনই দেখা দিয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় প্লেগের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে। ফলে দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ঠেকানো সম্ভব।
এ ছাড়া উন্নত দেশগুলোতে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশও সাধারণত বিদ্যমান নেই। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্কের অনেক দাবিকে বাস্তব ঝুঁকির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ
ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রও ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে তিনি এটিকে জৈব অস্ত্রের ঘটনা বলে মনে করেন না বলেও মন্তব্য করেছেন।
তবে রুশ সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা জানানো হয়েছে। রুশ কর্মকর্তারা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন অপ্রমাণিত তথ্যের পরিবর্তে সরকারি তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব
ঘটনাটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। একাধিক অ্যাকাউন্টে দ্বিতীয় একজন ল্যাবকর্মীর মৃত্যুর দাবি করা হলেও এর কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে লকডাউন, ব্যাপকভাবে প্লেগ ছড়িয়ে পড়া এবং গবেষণাগার থেকে ভয়াবহ জীবাণু বেরিয়ে যাওয়ার মতো দাবিও ছড়িয়েছে। এসব দাবির অনেকগুলোই যাচাই করা সম্ভব হয়নি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করেছে।
প্লেগ কোভিড-১৯-এর তুলনায় ‘১০০ গুণ বেশি প্রাণঘাতী’—এমন দাবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। তবে এমন তুলনা বিভ্রান্তিকর। প্লেগ চিকিৎসা না করা হলে অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে, কিন্তু দ্রুত শনাক্ত ও অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা দেওয়া হলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সাইবেরিয়ার ল্যাবকর্মীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনাটির সঙ্গে প্লেগের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিয়ে চূড়ান্ত তথ্য না আসা পর্যন্ত গুজবের ওপর নির্ভর না করে সরকারি ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্য অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।










