ভারতের সঙ্গে পদ্মা তথা গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। এর আগে নতুন চুক্তি না হলে বাংলাদেশে পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এতে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও সুন্দরবনের পরিবেশের পাশাপাশি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের ৭২ বছর বয়সী বিকাশ সরেনের স্মৃতিতে এখনো ভাসে গঙ্গার পুরোনো রূপ। একসময় সারা বছর নদীতে বড় বড় নৌকা চলাচল করত। কিন্তু এখন বছরের প্রায় তিন মাস নদীতে পানির প্রবাহ প্রায় দেখা যায় না বলে জানান তিনি।

বিকাশ সরেন বলেন, গত মৌসুমে পানির অভাবে ধান ও গমের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুই কৃষক আত্মহত্যা করেন।

গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় মাছের পরিমাণও কমেছে। ৫৫ বছর বয়সী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘এখন আমরা মাছ পাব কোথায়? আগে আমি অনেক ধরনের মাছ ধরতাম।’ বর্তমানে তিনি পুকুরে মাছ চাষ করছেন।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার ৫২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা নদীর অববাহিকায় বাংলাদেশের পাঁচ কোটির বেশি মানুষসহ প্রায় ৬৫ কোটি ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। ফলে নদীর পানিপ্রবাহ কমে গেলে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় শুষ্ক মৌসুমে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজে পানির ভাগ নির্ধারণ করা হয়। ব্যারাজটি বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উজানে অবস্থিত।

বাংলাদেশের পানি বণ্টনবিষয়ক কারিগরি কমিটির প্রধান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতে নতুন চুক্তি করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য মালিক ফিদা এ খান বলেন, নতুন চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি পুরো নদী অববাহিকাকে বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তি নবায়নের বিষয়ে আলোচনার অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো সাড়া দেয়নি বলে জানানো হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, নদীসংক্রান্ত বিষয়গুলো যৌথ নদী কমিশনের আলোচনার আওতাভুক্ত। কমিশনের সর্বশেষ কারিগরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে গত মে মাসে।

এদিকে, অভিন্ন তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির উদ্যোগও ২০১১ সাল থেকে আটকে আছে। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। গঙ্গার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে, যদিও সফর এখনো নিশ্চিত নয়।

১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করার পর থেকেই গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। বাংলাদেশের অভিযোগ ছিল, এর মাধ্যমে ভারত গঙ্গার অধিকাংশ পানি সরিয়ে নিচ্ছে। পরে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে ১৯৭৭ সালে একটি চুক্তি হয়। তবে পরবর্তী সময়ে পানি বণ্টনব্যবস্থায় বিরতি দেখা দিলে কয়েকটি নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায় বলে জানান পরিবেশবাদী সংগঠন রিভারাইন পিপলের শেখ রোকন।

তিনি বলেন, পদ্মার পানি কমে যাওয়ায় সুন্দরবনে মিঠাপানির সরবরাহকারী গড়াই নদীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির অভাবে দেশের বৃহত্তম গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

প্রকল্পটির আওতায় সেচ দেওয়া জমির পরিমাণ ৯৫৫ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে ৫৫০ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

গত মে মাসে বাংলাদেশ সরকার ২৮০ কোটি ডলারের পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। পানির সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি এ প্রকল্পের আওতায় ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান সতর্ক করে বলেন, নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষায় তীব্র বন্যা বাংলাদেশের কৃষি ও জনজীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদীর প্রশস্ততা প্রায় তিন কিলোমিটার বেড়েছে বলে জানানো হয়েছে।

চুক্তি নবায়ন না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদেরা। শেখ রোকনের ভাষায়, দুই দেশেই মিঠাপানির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই নতুন চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের পানিসংকট আরও গভীর হতে পারে।