স্পেনে দুটি উচ্চগতির ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন শতাধিক যাত্রী। দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে রেল চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী কম্পিউটার ব্যবস্থায় ত্রুটি এবং পরবর্তী সময়ে মানুষের নেওয়া একটি সিদ্ধান্তের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।

টলেডো প্রদেশের উর্দা শহরের কাছে মাদ্রিদ-সেভিল উচ্চগতির রেলপথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। একটি চলন্ত ট্রেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি ট্রেনের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে দুই ট্রেনের বেশ কয়েকটি বগি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, এ ঘটনায় পুরো দেশ শোকাহত।

নিহতদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় রেল কোম্পানি রেনফের ট্রেনের ২৪ জন এবং বেসরকারি কোম্পানি ইরিওর ট্রেনের ৪৪ জন যাত্রী রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরিওর ট্রেনটিতে ১৫১ জন এবং রেনফের ট্রেনে ৩৯৩ জন যাত্রী ছিলেন।

যেভাবে ঘটল ভয়াবহ দুর্ঘটনা

স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার দিন ট্রেন চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত এলজেডবি ব্যবস্থায় কম্পিউটারজনিত সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার রেলপথে নিরাপত্তাব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল না।

নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে ওই এলাকার ট্রেনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে থামিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় বেসরকারি রেল কোম্পানি ইরিওর একটি ট্রেনও রেললাইনে দাঁড়িয়ে ছিল।

স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেন রাষ্ট্রীয় রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা এডিআইএফের কর্মীরা। ফলে কম্পিউটারনির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল।

তদন্তের প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, দক্ষিণমুখী রেনফের ট্রেনটির সামনে লাল সংকেত ছিল। ওই সংকেতের অর্থ, ট্রেনটির সামনে এগোনোর অনুমতি নেই। তা সত্ত্বেও একজন ট্রেন নিয়ন্ত্রকের নির্দেশে ট্রেনটিকে চলতে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময় ট্রেনটির জন্য নির্দিষ্ট কোনো গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

পরিবহনমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৬ মিনিট থেকে ৮টা ৫২ মিনিটের মধ্যে রেনফের ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করে। একপর্যায়ে ট্রেনটির গতি ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটারে পৌঁছায়। সামনে একই রেলপথে দাঁড়িয়ে থাকা ইরিওর ট্রেনটিকে এড়ানো সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত পেছন থেকে ধাক্কা দিলে ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে।

পুয়েন্তে বলেন, ট্রেনটির সামনে লাল সংকেত ছিল, যা অতিক্রম করে এগোনো নিষিদ্ধ। তারপরও সেটিকে চলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

তদন্তের দাবি, পরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইল ইউনিয়ন

দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর স্পেনের ট্রেড ইউনিয়ন সিএসআইএফ পরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এডিআইএফের ট্রাফিক কর্মকর্তাকে দায়ী না করার আহ্বানও জানিয়েছে সংগঠনটি।

প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, দুর্ঘটনায় অবহেলা থাকলে তা তদন্তে উঠে আসবে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে তা কঠোরভাবে সংশোধন করা হবে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পেছনে কম্পিউটার ব্যবস্থার ত্রুটি, ট্রেন চলাচলের অনুমতি এবং নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো একটি কারণকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা যাচ্ছে না।

সংঘর্ষের মুহূর্তের ভয়াবহ বর্ণনা

দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে সংঘর্ষের ভয়াবহতা। এক যাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের ধাক্কায় অনেকে আসন থেকে ছিটকে অন্য যাত্রীদের ওপর গিয়ে পড়েন। এতে ট্রেনের ভেতরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

ওই যাত্রী জানান, তিনটি বগিতে বিশেষভাবে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছিল। একটি বগিতে আগুন ধরে যায়। অন্য একটি বগিতে আটকে পড়া যাত্রীরা সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বগিতে অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন।

রেনফের যাত্রী প্যাট্রিসিয়া জানান, দুর্ঘটনার আগে তাদের ট্রেনটি প্রায় ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল। যাত্রীদের বলা হয়েছিল, রেলপথে ট্রেনের চাপ বেশি। পরে ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করে। কিন্তু মাত্র তিন মিনিটের মধ্যেই সংঘর্ষ ঘটে।

প্যাট্রিসিয়ার ভাষ্য, সংঘর্ষের সময় কিছু যাত্রী বাতাসে ছিটকে পড়েছিলেন। পুরো দৃশ্য ছিল ভয়াবহ।

উদ্ধার অভিযানে পাঁচ শতাধিক কর্মী

দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু করে স্পেনের জরুরি সেবা বিভাগ। পাঁচ শতাধিক উদ্ধারকর্মী মোতায়েনের পাশাপাশি পাঠানো হয় অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও পুলিশ সদস্যদের। উদ্ধারকাজে অন্তত তিনটি হেলিকপ্টার এবং কয়েকটি ড্রোন ব্যবহার করা হয়।

গুরুতর আহত নন, এমন যাত্রীদের বাসে করে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। আহতদের চিকিৎসার জন্য উর্দা শহরেও জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। রেডক্রসের কর্মীরা স্থানীয় একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে আহতদের চিকিৎসাসেবা দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন।

এক বছরে একাধিক রেল দুর্ঘটনা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

স্পেনে পরপর প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনার ঘটনায় দেশটির রেল অবকাঠামো ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে কর্দোবা প্রদেশের আদামুসের কাছে আরেকটি উচ্চগতির ট্রেন দুর্ঘটনায় ৪০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। ওই দুর্ঘটনাস্থল বর্তমান দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৩০ মাইল দূরে একই মাদ্রিদ-সেভিল রেলপথে অবস্থিত।

এর কয়েক দিন পর বার্সেলোনার কাছে ভারী বৃষ্টির মধ্যে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। ওই ঘটনায় ট্রেনের চালক নিহত হন এবং আহত হন কয়েক ডজন যাত্রী।

অতীতে ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় স্পেনের রেল নিরাপত্তার রেকর্ড ভালো ছিল। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশটিতে প্রতি ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে রেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ছিল একেরও কম, যা তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল।

সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলো স্পেনের রেল অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, কম্পিউটারনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষ।