সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকেন আবদিফাতাহ মোহাম্মদ। জীবনের ২০ বছর কাটিয়েছেন মাছ ধরে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে নৌকা নিয়ে সমুদ্রে নামা শুরু করেছিলেন তিনি। একসময় মাছ ধরে পরিবারের খরচ চালাতে পারলেও এখন সেই জীবিকা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। বিদেশি বড় বড় মাছ ধরার ট্রলারের কারণে মাছ কমে গেছে। লবস্টার পাওয়াও আগের মতো সহজ নয়।
সোমালিয়ার পুন্টল্যান্ড উপকূলের ছোট্ট শহর বান্দের বেইলার এই জেলের কাছে সমুদ্র এখন আর শুধু জীবিকার উৎস নয়, ভয়েরও নাম। কারণ, এই উপকূলেই আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। তাদের জাহাজ ছিনতাই ঠেকাতে নিরাপত্তা অভিযান চলছে, আকাশে টহল দিচ্ছে সামরিক হেলিকপ্টার। এর মধ্যেই মাছ ধরতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ জেলেরা।
২০২৬ সালে সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের তৎপরতা নতুন করে বেড়েছে। ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নজরদারিতে পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
১৯৯১ সালে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ভেঙে পড়ার পর দেশটির উপকূলীয় জলসীমায় নজরদারি দুর্বল হয়ে যায়। এ সুযোগে বিদেশি জাহাজের অবৈধ মাছ ধরার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, বড় ট্রলারগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাঁরা পেরে উঠছেন না। জীবিকা হারানোর ক্ষোভ থেকে উপকূলের কিছু মানুষ একসময় অস্ত্র হাতে সমুদ্রে নামেন। পরে তাঁদের একাংশের তৎপরতা সংগঠিত জাহাজ ছিনতাই ও মুক্তিপণ আদায়ের অপরাধে রূপ নেয়।
মোহাম্মদ জানান, জেলেরা বড় ট্রলারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারেন না। এর প্রভাব পড়ে স্থলভাগে থাকা তাঁদের পরিবারের ওপরও। তাঁর ভাষ্য, সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ জলদস্যুতায় জড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু এর কারণে পুরো এলাকার মানুষকেই ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
জলদস্যুদের তৎপরতা ঠেকাতে আগস্টের শেষ দিকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জেলেদের সমুদ্রে যাওয়ার ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দেয়। আশঙ্কা ছিল, জলদস্যুরা জেলে সেজে চলাচল করতে পারে। ফলে অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন, এমন জেলেরাও সংকটে পড়েন।
স্থানীয় জেলে আবদিরিজাক সাঈদের অভিযোগ, জলদস্যুদের কাছে খাবার বা অন্যান্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগে বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে। দোকানিদেরও জলদস্যুদের কাছে পণ্য বিক্রি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে মাছ ধরা, ব্যবসা ও পণ্য সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই অচলাবস্থা তৈরি হয়।
জলদস্যুতার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তেলবাহী জাহাজ ‘অনার ২৫’ ছিনতাইয়ের ঘটনায়। ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল জাহাজটিতে হামলা চালায় সশস্ত্র জলদস্যুরা। জাহাজটিতে ১৭ জন নাবিক ছিলেন। তাঁদের বেশির ভাগই প্রায় পাঁচ মাস বন্দিদশায় কাটান।
জাহাজের দ্বিতীয় প্রকৌশলী সৈয়দ হুসাইন ইউসুফ এবং নাবিক ইয়াসির খানের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলার সময় গুলি ছুড়তে ছুড়তে জাহাজে উঠে আসে জলদস্যুরা। নাবিকদের ব্রিজে আটকে রাখা হয়। বন্দিদশায় তাঁদের চলাফেরা সীমিত হয়ে পড়ে এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
ইউসুফ জানান, প্রথমে জলদস্যুরা ৭০ লাখ ডলার মুক্তিপণ দাবি করেছিল। পরে দর-কষাকষির মাধ্যমে দাবির পরিমাণ ১০ লাখ ডলারে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়। কিন্তু নাবিকদের মুক্তির অপেক্ষা দীর্ঘ হতে থাকে।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পুন্টল্যান্ডের সামুদ্রিক পুলিশ জাহাজটি উদ্ধারে অভিযান চালায়। গোলাগুলির মধ্যে জলদস্যুদের নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষ বাধে। নাবিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, গুলিতে পাঁচজন নাবিক নিহত হন এবং আরও কয়েকজন আহত হন। পরে নিরাপত্তা বাহিনী জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ‘অনার ২৫’, ‘সিমুল’ ও ‘ইউরেকা’—জলদস্যুদের দখলে থাকা তিনটি জাহাজ মুক্ত করা হয়। সব মিলিয়ে ৪৪ জন নাবিককে মুক্ত করা হয়। ‘অনার ২৫’ উদ্ধারের ঘটনায় পাঁচজন নাবিকের মৃত্যুর তথ্যও জানানো হয়।
যুদ্ধের সুযোগ, নাকি বেঁচে থাকার তাগিদ?
সোমালিয়ার জলদস্যুদের ফিরে আসার পেছনে নিরাপত্তার ঘাটতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটও বড় ভূমিকা রাখছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়েছে। সোমালিয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বড় অংশ আমদানি করে। যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় দেশটির ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে হুতিদের হামলার কারণে জাহাজ চলাচলের পথ বদলেছে। কিছু জাহাজ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যাওয়ার অতিরিক্ত ব্যয় এড়াতে সোমালিয়ার উপকূলের কাছাকাছি দিয়ে চলাচল করছে। এতে জলদস্যুদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা বাড়ছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দিতে নৌবাহিনীর কিছু সম্পদ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ায় সোমালিয়ার উপকূলে নজরদারির চাপ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজ ছিনতাই করে বড় অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় এখনো জলদস্যুদের কাছে লাভজনক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক দুর্দশাও কিছু মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসব পরিস্থিতি জলদস্যুতাকে ন্যায্যতা দেয় না; বরং সমস্যাটির গভীরতা তুলে ধরে।
জলদস্যুদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ
বান্দের বেইলার কিছু বাসিন্দা তরুণদের জলদস্যুতায় যোগ দেওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছেন। মোহাম্মদের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি অস্ত্র নিয়ে সমুদ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া কয়েকজন তরুণকে স্থানীয় বাসিন্দারা থামিয়ে দেন। তাঁদের আশঙ্কা, এ ধরনের হামলা হলে পুরো সম্প্রদায়কে এর মূল্য দিতে হবে।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অভিযান সফল হওয়ার পর ১ অক্টোবর মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান। তবে উপকূলে সামরিক হেলিকপ্টারের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
জেলে সাঈদের বলেন, আকাশে উড়োজাহাজের শব্দ যত জোরে শোনা যায়, তাঁরা বুঝতে পারেন নজরদারি আরও কাছে এসেছে। আর মোহাম্মদের চাওয়া খুব সাধারণ—সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরে নিরাপদে ঘরে ফিরতে চান তিনি।






