মধ্যপ্রাচ্য
ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সৌদির বৃহত্তম তেল স্থাপনা, সরবরাহ নিয়ে বৈশ্বিক শঙ্কা

সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল শোধনাগার আবকাইক কমপ্লেক্সে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে হামলার ফলে স্থাপনাটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এ হামলার দায় স্বীকার করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সোমবার সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আবকাইক তেল শোধনাগার কমপ্লেক্সে ড্রোন হামলা চালানো হয়। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবিতে স্থাপনাটির কিছু অংশে পোড়া দাগ ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে শোধনাগার এলাকা থেকে ঘন কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়।
হামলার দায় স্বীকার করে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জানান, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র লক্ষ্য করেই এ হামলা চালানো হয়েছে। যদিও তিনি সরাসরি আবকাইকের নাম উল্লেখ করেননি, তবে তার দেওয়া বিবরণ ওই স্থাপনাটির সঙ্গেই মিল রয়েছে।
আবকাইক কমপ্লেক্স সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোকে লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু রপ্তানি টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এখান থেকেই ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল ইয়ানবুতে পৌঁছায়। পরে সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি হয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তেল রপ্তানি করা হয়।
সৌদি কর্তৃপক্ষ পূর্বাঞ্চলের তেল অবকাঠামোয় হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও এ ঘটনার জন্য ইরাকে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছে। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল উপসাগরীয় এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, হামলায় আবকাইক কমপ্লেক্সের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে সীমিত।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত আবকাইক আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। বিশ্বের দৈনিক ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৫ শতাংশ এই কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে সৌদি আরবের জন্য ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই সরবরাহ ব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের বিঘ্ন সৌদির তেল রপ্তানিতে প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদির জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিদের ধারাবাহিক হামলার অংশ হিসেবেই এ ঘটনা ঘটেছে। হুতিদের দাবি, ইয়েমেনে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা এই অভিযান চালিয়েছে। একই সঙ্গে রিয়াদ আবার সামরিক অভিযান শুরু করায় সৌদির বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের হুমকিও দিয়েছে গোষ্ঠীটি।
এ হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার লক্ষ্য এখন শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোও।
এদিকে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক প্রতিবেদনে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের আগে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্ক করেনি বলে তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, চলমান উত্তেজনা আরও বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো নতুন করে হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও।








