বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি। মার্চ শেষে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে নতুন করে ৫ হাজার ৭৭টি কোটিপতি হিসাব যুক্ত হয়েছে।
একই সময়ে এসব হিসাবে মোট আমানত ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ তিন মাসে কোটিপতি হিসাবগুলোতে আমানত বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা।
ব্যক্তি পর্যায়ে কমেছে আমানত
সামগ্রিকভাবে কোটিপতি হিসাব বাড়লেও ব্যক্তি পর্যায়ে আমানতের চিত্র ভিন্ন। জুন শেষে ব্যক্তিশ্রেণির এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৭০১টি। মার্চ শেষে এ সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৬৩০টি। অর্থাৎ তিন মাসে ব্যক্তি পর্যায়ে কোটিপতি হিসাব বেড়েছে মাত্র ৭১টি।
তবে হিসাবের সংখ্যা সামান্য বাড়লেও এসব হিসাবে জমা অর্থ কমেছে। মার্চে ব্যক্তিশ্রেণির কোটিপতি হিসাবে আমানত ছিল ৯১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। জুন শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ১৩১ কোটি টাকায়। ফলে তিন মাসে ব্যক্তি পর্যায়ে আমানত কমেছে ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা।
প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলেই মূলত বেড়েছে আমানত
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এক কোটি টাকার বেশি আমানতের হিসাবে শুধু ব্যক্তির অর্থ নয়; সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির হিসাবও রয়েছে। ফলে কোটিপতি হিসাবের মোট আমানত বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব থেকে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা অর্থ নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ না হয়ে ব্যাংকে পড়ে থাকছে।
বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, ব্যাংকে জমছে প্রতিষ্ঠানের অর্থ
সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি উচ্চ সুদহার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের গতি কমেছে।
এ অবস্থায় অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্পে অর্থ ব্যয় না করে চলতি মূলধন, ব্যবসায়িক লেনদেনের অর্থ এবং সাময়িকভাবে অব্যবহৃত তহবিল ব্যাংকে জমা রাখছে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক কোটিপতি হিসাবের আমানত বাড়ছে।
মূল্যস্ফীতির চাপে কমছে ব্যক্তিগত সঞ্চয়
অন্যদিকে ব্যক্তি পর্যায়ে কোটিপতি হিসাবের আমানত কমার পেছনে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক মানুষের সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমেছে। ফলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বড় অঙ্কের আমানত ধরে রাখার প্রবণতাও কিছুটা কমেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা বাড়লেই ব্যক্তিগত সম্পদ বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ পরিসংখ্যানে ব্যক্তি হিসাবের পাশাপাশি বড় অঙ্কের প্রাতিষ্ঠানিক ও করপোরেট হিসাবও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মোট ব্যাংক হিসাবের তুলনায় কোটিপতি হিসাব খুবই কম
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানত হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টি। এর মধ্যে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে মাত্র ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি হিসাবে।
অর্থাৎ মোট ব্যাংক হিসাবের তুলনায় কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা খুবই সামান্য। তবে এসব হিসাবেই ব্যাংক ব্যবস্থার বিপুল পরিমাণ অর্থ কেন্দ্রীভূত রয়েছে।
সব মিলিয়ে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তি পর্যায়ে বড় অঙ্কের সঞ্চয় কিছুটা কমলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকে অর্থ ধরে রাখার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা ও মোট আমানত—দুটিই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তবে এ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল—এমনটাই উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে।









