বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে সরকারি দলের সদস্যরা সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন। কোথাও কোথাও বিরোধী দলের বক্তব্য নিয়ে টিপ্পনীও করেছেন তারা। অন্যদিকে, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সংসদের বাইরেও আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী দল।

সংবিধান সংস্কার নিয়ে শুরুতেই মতবিরোধ

অধিবেশনের শুরু থেকেই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এক হয়নি।

citytouch 728-X-90

জামায়াত ও এনসিপি জোটভুক্ত সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি জোটের সদস্যরা শপথ নেননি। পরে গণভোটসংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংবিধানে না থাকায় সরকার সেটি বাতিল করে। এরপর সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের জন্য কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতেও বিরোধী দল একমত হয়নি।

শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই সংবিধান সংশোধনে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্যপদ রাখা হলেও এখন পর্যন্ত তারা সদস্যদের নাম দেয়নি।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে অভিযোগ

১০ সেপ্টেম্বর অধিবেশনের শেষ দিনে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিশেষ কমিটিতে সদস্য না দেওয়ার কারণ তুলে ধরে সরকারের বিরুদ্ধে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহার অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, গণরায় পাশ কাটিয়ে সরকার নিজেদের পছন্দমতো সংবিধান সংশোধনের পথে এগোচ্ছে। বিএনপির ৩১ দফার প্রথম দফাতেই সংবিধান সংস্কারের কথা ছিল উল্লেখ করে তিনি এটিকে শুধু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখানো জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলেও মন্তব্য করেন।

তার বক্তব্যে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি বলেন, জনগণের রায় উপেক্ষা করার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে কোনো সরকারের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার পথ বন্ধ করা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

কুরআন-সুন্নাহ নিয়ে সংসদে উত্তাপ

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধন নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আইনটি তাড়াহুড়া করে পাস না করে কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।

তবে বিরোধিতা সত্ত্বেও বিলটি পাস হয়। জামায়াতের আমির এ নিয়ে সরকারের সমালোচনা করে বলেন, এমন উদ্যোগ ইংরেজ আমলেও দেখা যায়নি। পাকিস্তান আমলেও এ ধরনের উদ্যোগ সফল হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা শরিয়াহ আইনের কথা বলে বিলটির বিরোধিতা করছেন। অথচ তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে শরিয়াহ আইন চালুর কোনো অঙ্গীকার ছিল না। বয়স্ক বাবা-মায়ের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনটি গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

র‍্যাব বিলুপ্তি নিয়েও দ্বিমত

র‍্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) গঠনের বিল নিয়েও সংসদে তীব্র বিতর্ক হয়।

বিরোধী দলের দাবি, র‍্যাবের জনবল, সম্পদ, নথিপত্র, স্থাপনা, অর্থ ও দায়-দায়িত্ব নতুন বাহিনীতে স্থানান্তর করা হলে নাম পরিবর্তন ছাড়া কার্যত একই বাহিনী থেকে যাবে। তাদের ভাষায়, এটি হবে ‘নতুন বোতলে পুরনো মদ’।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইন পাস হলে র‍্যাব বিলুপ্ত হবে এবং নতুন ব্যাটালিয়ন হিসেবে এসআরবি গঠিত হবে। নতুন বাহিনীর সঙ্গে র‍্যাবের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট না করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সম্পদ নতুন বাহিনীতে স্থানান্তর করা হবে বলে জানান তিনি।

মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধ বিল নিয়ে ওয়াকআউট

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়েও আপত্তি জানায় বিরোধী দল। তাদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ দুটি আইনকে দুর্বল করে সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বিল দুটি উত্থাপনের দিন বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। পরে পাসের প্রক্রিয়া শুরুর আগেও তারা সংসদ থেকে বেরিয়ে যান। বিরোধী দলের বক্তব্য, তাদের মূল সংস্কার দাবিগুলো উপেক্ষা করে খণ্ডিত প্রক্রিয়ার অংশ হতে তারা রাজি নন।

সংরক্ষিত নারী এমপিদের দায়িত্ব নিয়েও ক্ষোভ

বিএনপির সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের জামায়াত ও এনসিপি জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও বিরোধী দলের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

বিরোধী দলের নেতাদের অভিযোগ, নির্বাচিত বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখতে পারছেন না। অথচ তাদের এলাকায় সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার দায়িত্ব দেওয়া উচিত। এ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।

উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ

উন্নয়ন বরাদ্দ ও তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দল। তাদের দাবি, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা উন্নয়ন বরাদ্দ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য ১৫ দিন আগে পেলেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা তা পান মাত্র তিনদিন আগে।

শুধু তথ্য পাওয়ার সময় নয়, বরাদ্দের পরিমাণেও পার্থক্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ বিরোধী দলের। তাদের মতে, সংসদে রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্য থাকা উচিত নয় এবং আনুপাতিক ব্যবস্থা অনুসরণ করা প্রয়োজন।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উত্তাপ

বিএনপির সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করেও সংসদে উত্তাপ ছড়ায়।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতি ও পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ বর্জনের ঘোষণা নিয়ে সমালোচনা করা হয়। বিষয়টিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবেও উল্লেখ করেন বিরোধীদলীয় নেতা।

তিনি অতীতের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা না হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

সরকারি চাকরির ভাইভা নম্বর বাড়ানো নিয়েও আপত্তি

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ভাইভা নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও বিরোধী দল আপত্তি জানিয়েছে।

তাদের বক্তব্য, ২০২৪ সালের আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল মেধার যথাযথ মূল্যায়ন। এখন ভাইভায় নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয় পছন্দ-অপছন্দ বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে নতুন করে আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছে বলেও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি ভবিষ্যতে বড় আন্দোলনের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেন বিরোধীদলীয় নেতা।

সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ নিয়েও ক্ষোভ

তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যেই সংবিধানের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী জাতীয় সংসদের ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটির কয়েকটির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন জ্যেষ্ঠ ও নবীন সংসদ সদস্যরা।

সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ আনুপাতিক হারে দেওয়ার কথা বলা হলেও বিরোধী দলের অভিযোগ, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।

বিরোধী দলের হিসাবে, সংসদে তাদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব অনুযায়ী প্রায় ২৬ শতাংশ কমিটির সভাপতির পদ পাওয়ার কথা থাকলেও তারা পেয়েছে মাত্র একটি। বিষয়টি সংসদে তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল সদস্য মনোনীত করলে তাদের কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়েও বিরোধী দল একবার সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।

সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও কর্মসূচি

সংসদের ভেতরে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে বিরোধের পাশাপাশি রাজপথেও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী দল।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারি দলের কয়েকজন নেতা সমালোচনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, লংমার্চ করে যদি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা যেত, তাহলে সরকারই সবার আগে লংমার্চ করত।

জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিভিন্ন দাবি নিয়ে তারা লংমার্চ করেছেন। গাড়ির বহর নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, কর্মসূচিতে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য তারা সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করেননি।

তিনি জানান, জনগণের দাবি নিয়ে লংমার্চ অব্যাহত থাকবে। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে পরবর্তী লংমার্চ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানান তিনি।

সমঝোতার বদলে বাড়ছে দূরত্ব

সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আগের দুই অধিবেশনের তুলনায় রাজনৈতিক দূরত্ব আরও দৃশ্যমান হয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে সমঝোতার পরিবর্তে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, প্রতিবাদ ও ওয়াকআউটের ঘটনাই বেশি দেখা গেছে।

শুধু এসআরবি বিল নিয়ে বিরোধী দলের অনুরোধে একদিন অধিবেশনের সময় বাড়ানো ছাড়া বড় কোনো বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সমঝোতা হয়নি।

সংসদের ভেতরে মতবিরোধের পাশাপাশি সংসদের বাইরেও আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী দল। ফলে পরবর্তী অধিবেশন ও রাজপথের কর্মসূচিতে সরকার-বিরোধী দলের সম্পর্ক আরও কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।