শিশুদের নিজেদের প্রতিভা ও গুণাবলি বিকাশের সুযোগ করে দিতে পারলে দেশের ভবিষ্যৎ আরও শক্তিশালী হবে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। একটি পরিবারের ভিত্তি যেমন সন্তানদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার ওপর নির্ভর করে, তেমনি দেশের ভবিষ্যৎও শিশুদের সঠিক বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) শিশু অধিকার দিবস ২০২৬ এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলা হয়।
অনুষ্ঠানে শিশুদের মতামত ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। শিশুদের জন্য আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানে শুধু বড়দের বক্তব্য নয়, বরং শিশুদের কথা শোনা এবং তাদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়।
শিশুদের বিভিন্ন ধরনের প্রতিভার কথা তুলে ধরে বলা হয়, কেউ ভালো ছবি আঁকতে পারে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করতে পারে, কেউ গান, নাচ কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পছন্দ করে। প্রত্যেক শিশুর মধ্যেই কোনো না কোনো বিশেষ গুণ রয়েছে। সেই গুণ বিকাশের জন্য প্রয়োজন যথাযথ পরিবেশ ও সুযোগ।
যেসব শিশু গিটার, হারমোনিয়াম, বাঁশি কিংবা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র শেখার প্রতি আগ্রহী, তাদের সেই আগ্রহকে উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একইভাবে গান, নাচ, আবৃত্তি, কেরাত ও কোরআন তেলাওয়াতসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে আগ্রহী শিশুদের নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
খেলাধুলায় শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ
শিশুদের প্রতিভা বিকাশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিশুদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়। এরই অংশ হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে সারাদেশে ফুটবল প্রতিযোগিতায় বিপুলসংখ্যক ছেলে ও মেয়ে অংশ নিয়েছে বলে জানানো হয়।
এ ধরনের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চালু রাখা গেলে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ভবিষ্যতের প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
শিশুদের সাংস্কৃতিক বিকাশের পাশাপাশি ক্রীড়া কার্যক্রমও আরও জোরদার করার কথা বলা হয়। শিশুদের শিল্প, সংস্কৃতি, সংগীত ও খেলাধুলার অন্তত একটি ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন বলেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শহর-গ্রামের সব শিশুর জন্য সমান সুযোগ
শিশুদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ যেন শুধু শহরের শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দেশের অনেক পরিবারের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে সন্তানদের গান, নাচ, বাদ্যযন্ত্র, খেলাধুলা কিংবা অন্যান্য সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা কঠিন। তাই স্কুল পর্যায় থেকেই শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের জন্য এসব সুযোগ তৈরি করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
প্রত্যেক শিশুর মধ্যে কোনো না কোনো বিশেষ গুণ রয়েছে। সেই গুণটি চিহ্নিত করে তাকে উপযুক্ত সুযোগ করে দিতে পারলে শিশুরা নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম আরও গুছিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সেগুলো আরও বিস্তৃতভাবে চালুর লক্ষ্য রয়েছে বলে জানানো হয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ অনুযায়ী গান, বাদ্যযন্ত্র ও খেলাধুলার বিভিন্ন ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ
ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে শিশুদের প্রস্তুত করতে স্কুল পর্যায় থেকেই অতিরিক্ত বিদেশি ভাষা শেখানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, ম্যান্ডারিন, জার্মান, জাপানিজসহ বিভিন্ন বিদেশি ভাষার মধ্য থেকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী একটি ভাষা শেখার সুযোগ পেতে পারে।
এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকৃতি ও প্রাণীর প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান
শিশুদের শুধু পড়াশোনা, শিল্প ও খেলাধুলায় দক্ষ করে তোলাই নয়, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের প্রতিও দায়িত্বশীল করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিশুদের বাড়ি, স্কুল কিংবা আশপাশের এলাকায় থাকা গাছের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি পশুপাখির প্রতিও সদয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাণীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ শিশুদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর এই মূল্যবোধ থেকেই ভবিষ্যতে আরও মানবিক, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি হবে।
শিশুদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধ—সবকিছুর সমন্বিত বিকাশ প্রয়োজন। শিশুদের সেই সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠবে।








