অর্থনীতির ধীরগতির প্রভাব পড়েছে মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রায়। চলতি ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ার পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থানও কমেছে।

ফলে দেশের অর্থনৈতিক সংকট শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রায়।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাত ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

citytouch 728-X-90

ধীরগতিতে অর্থনীতি, আটকে থাকতে পারে প্রবৃদ্ধি

প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমেছে।

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এর প্রভাব পড়েছে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের ওপরও। বিশেষ করে নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

এক বছরে দরিদ্র বেড়েছে ২১ লাখ

কর্মসংস্থানের দুর্বলতাকে দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে।

একই সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় থেমে গেছে। বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় আয় হারানোর ঝুঁকি বেড়েছে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর।

অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বেরিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং নতুন ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষায় বড় ঘাটতি

নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়া মানুষের বড় অংশকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।

বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিচ্ছে। তবে যাদের সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন, তাদের একটি বড় অংশ এসব কর্মসূচির বাইরে রয়েছে।

এ অবস্থায় সীমিত সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সুবিধাভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও উন্নত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তথ্যভিত্তিকভাবে উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে যুক্ত করা সম্ভব হলে সহায়তার কার্যকারিতা বাড়বে।

সমন্বিত সহায়তায় দারিদ্র্য কমানোর সুযোগ

দারিদ্র্য কমাতে বিদ্যমান খাদ্য ও নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচিকে সমন্বিত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির আরও ভালো সমন্বয় করা গেলে অতিরিক্ত প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ দরিদ্র পরিবারের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে ঝুঁকি

দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে কর্মসংস্থানের সংকট বড় কারণ হলেও অর্থনীতির অন্যান্য খাতের দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অন্যতম বড় ঝুঁকি।

২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এ হার ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।

খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকের ঋণ বিতরণ সক্ষমতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজস্ব আদায়েও দুর্বলতা

সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্বল রাজস্ব আহরণ। ২০২৬ অর্থবছরে দেশের রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে, যা বৈশ্বিক তুলনায় খুবই কম।

রাজস্ব আদায় কম থাকায় উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতা সীমিত হচ্ছে। একই সময়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য সহায়তার প্রয়োজন বাড়ায় সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

২০২৫ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি সংকটেও অর্থনীতিতে চাপ

জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তাও অর্থনীতির গতি কমিয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ। জ্বালানি সংকট ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পরিবেশ আরও দুর্বল হয়েছে।

অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশও আরও স্থিতিশীল করা প্রয়োজন।

বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি

দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে নানা চাপ থাকলেও বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে দেশের বহিঃখাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

সংস্কারে গতি এলে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা

বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত দূর করা। ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা না গেলে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

তবে সংস্কার কার্যক্রমে গতি আনা গেলে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে গেলে ২০২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধির চিত্র

দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি বছর এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে।

এ অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশকে নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। এজন্য দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, বিনিয়োগ ও রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা। দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে এসব সংকট মোকাবিলা করা গেলে অর্থনীতি আবারও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে।