আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজশাহী-৬ আসন থেকে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন শাহরিয়ার আলম। দায়িত্ব পালন করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবন ও দ্বিতীয় স্ত্রী সিলভিয়া পারভীন লেনিকে ঘিরেও নানা আলোচনা রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের দিকে নাটোরের লালপুর উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মর্ত্তুজা বাবুর মেয়ে সিলভিয়া পারভীন লেনিকে বিয়ে করেন শাহরিয়ার আলম। এটি তাঁদের দুজনেরই দ্বিতীয় বিয়ে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিলভিয়ার মা রোকসানা মর্ত্তুজা ২০২১ সালে লালপুরের গোপালপুর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। এ সময় শাহরিয়ার আলমের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানো হয়েছিল কি না, তা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে সিলভিয়ার জন্য লালপুরে বাড়ি নির্মাণ এবং ঢাকার গুলশানে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট উপহার দেওয়ার দাবিও সামনে এসেছে। এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।
সংবাদ উপস্থাপনা থেকে রাজনীতিতে
শাহরিয়ার আলমকে বিয়ের আগে সিলভিয়া পারভীন লেনি সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। একুশে টেলিভিশনে সংবাদ পাঠের মধ্য দিয়ে তাঁর উপস্থাপনা শুরু হয়। পরে একাত্তর টেলিভিশনেও সংবাদ উপস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। এ ছাড়া এফএম রেডিও ‘রেডিও ঢোল’-এর পরিচালক হিসেবেও তাঁর দায়িত্ব পালনের কথা জানা যায়।
সিলভিয়া আওয়ামী লীগের গবেষণা ও যোগাযোগসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশনের (সিআরআই) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি সক্রিয়। ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন এবং দলটির কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে বিভিন্ন তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
সিলভিয়ার বেড়ে ওঠা নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুরে। তিনি যুক্তরাজ্যের লন্ডন মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন বলে জানা যায়।
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার তথ্য
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সিলভিয়া পারভীন লেনির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আদালতের আদেশের বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
শাহরিয়ার আলমের বিদেশে অবস্থান নিয়ে আলোচনা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে শাহরিয়ার আলম দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পরে থাইল্যান্ড হয়ে রাশিয়ায় যাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ভারতের কলকাতার নিউটাউনে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে শাহরিয়ার আলম ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী বসবাস করছেন বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও অন্যান্য নেতার যাতায়াত এবং তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে তাঁদের বর্তমান অবস্থান, সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস কিংবা কথিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য স্বাধীন প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
শাহরিয়ার আলমের বিরুদ্ধে মামলা ও আর্থিক অনুসন্ধান
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাহরিয়ার আলমের বিরুদ্ধে রাজশাহীর তিনটি থানায় চারটি মামলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত বছরের ২৪ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে বলে দাবি করা হয়েছে।
তাঁর ছয়টি ব্যাংক হিসাবে ২৬০ কোটি ৯৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও উল্লেখ রয়েছে। তবে সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য, মামলা দায়ের এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের অগ্রগতি ও আদালতের সিদ্ধান্ত জানা গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের দ্বিতীয় স্ত্রী সিলভিয়া পারভীন লেনিকে ঘিরে আলোচনা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর পেশাগত জীবন, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগ এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার তথ্যও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব বিষয়ে নির্ভুল চিত্র পেতে সংশ্লিষ্ট নথি, আদালতের আদেশ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি দাবি যাচাই করা জরুরি।










