আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে সরকার। এই ঋণের শর্ত হিসেবে জ্বালানি ও কৃষি খাতে ভর্তুকি কমানোর চাপ দিচ্ছে সংস্থাটি। পর্যায়ক্রমে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের দাম বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে তারা।

বিশ্ববাজারে ফার্নেস অয়েল, কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের লোকসান প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে ভর্তুকির চাপ কমাতে কঠোর সংস্কারের শর্ত দিয়েছে আইএমএফ।

২০২৮ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য একটি মধ্যবর্তী সংস্কার রোডম্যাপ তৈরির তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ক্যাপাসিটি চার্জ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রাও জানতে চেয়েছে আইএমএফ।

সরকারি কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, গত মাসে অর্থ বিভাগের উদ্যোগে জ্বালানি খাতের ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে একটি অনলাইন বৈঠক হয়। সেখানে বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো এবং জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনা করা হয়।

আইএমএফের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী তিন বছরের সংস্কার পরিকল্পনায় প্রতিবছর জিডিপির কত শতাংশ ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশে কী পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হবে, স্থানীয় বাজারমূল্য কত হবে এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তারও বিস্তারিত পরিকল্পনা থাকতে হবে।

এ ছাড়া পিডিবির ক্যাপাসিটি চার্জ, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তির মেয়াদ, কেন্দ্রভিত্তিক ভর্তুকি এবং বিদ্যুৎ আমদানির ব্যয়ের তথ্য চেয়েছে সংস্থাটি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অদক্ষতা কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী, শুধু জ্বালানির দাম বাড়ালেই হবে না; বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানোর উপায় এবং দরিদ্র গ্রাহকদের সুরক্ষায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও রোডম্যাপে উল্লেখ করতে হবে। পাশাপাশি ২০২৮ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে কত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে, তার পরিকল্পনাও চাওয়া হয়েছে।

সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে সরকার। গ্যাস খাতের তথ্য সংগ্রহের জন্য পেট্রোবাংলাকেও নির্দিষ্ট ছক পাঠিয়েছে আইএমএফ।

এলএনজি আমদানিতে বাড়ছে লোকসান

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে কাতার ও ওমান থেকে প্রতি ইউনিট এলএনজি ৯ থেকে ১০ ডলারে কেনা হতো। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে ৩৪ থেকে ৩৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গ্যাস সরবরাহে জটিলতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।

আগে এক কার্গো এলএনজি আমদানিতে ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি ডলার ব্যয় হলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

বর্তমানে দেশীয় ও আমদানি করা গ্যাসের মিশ্রণে প্রতি ইউনিটের দাম পড়ছে ৫২ টাকা ১৮ পয়সা। অথচ গ্রাহকের কাছে তা বিক্রি হচ্ছে ২৩ টাকা ৯০ পয়সায়। ফলে প্রতি ইউনিটে সরকারের লোকসান হচ্ছে ২৮ টাকা ২৮ পয়সা।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে লোকসান ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ২৭৭ কোটি টাকায়। চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত লোকসানের পরিমাণ ২৫ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিপরীতে ইতোমধ্যে ১৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলেও বড় লোকসান

বিদ্যুৎ খাতেও পিডিবিকে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংস্থাটির লোকসান ছিল ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। ওই বছর ২৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান বেড়ে ৪৪ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

গত জুনে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ শতাংশ বাড়ানো হলেও কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চলতি অর্থবছরে পিডিবির লোকসান ৬৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্যে সাড়ে ৮ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদিত হচ্ছে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল দিয়ে। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, আগে প্রতি টন ফার্নেস অয়েলের দাম ৩০০ থেকে ৩৫০ ডলার থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৯০০ ডলারে পৌঁছেছে। ভ্যাট ও করসহ ফার্নেস অয়েল দিয়ে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ পড়ছে প্রায় ৩১ টাকা।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় গত ২০ সেপ্টেম্বর দেশে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনে কম দামে বিক্রি করায় মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ২৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। দাম বাড়ানোর পর লোকসান কিছুটা কমলেও এখনো প্রতি মাসে ২ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।

আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী, বিপিসিকে লোকসানে জ্বালানি তেল বিক্রির ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে, বিশেষ করে সারের ভর্তুকিও কমাতে হবে। সংস্থাটির মতে, ভর্তুকি কমিয়ে যে অর্থ সাশ্রয় হবে, তা অন্যান্য জরুরি খাতে ব্যয় করা সম্ভব হবে।