স্বল্প আয়তনের বাংলাদেশে জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে নগরায়ণ। বড় শহরের পাশাপাশি ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলেও বাড়ছে অপরিকল্পিত বসতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশের বড় অংশ নগরায়ণের চাপে পড়বে। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও সারা দেশের জন্য কার্যকর কোনো সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান গড়ে ওঠেনি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ এলাকা এখনো মহাপরিকল্পনার আওতার বাইরে। বাকি ১৬ শতাংশ এলাকার জন্য পরিকল্পনা থাকলেও এর বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অপরিকল্পিত নগরায়ণের সঙ্গে বাড়ছে সড়ক, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট।

এমন পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘সুপরিকল্পনায় গড়ে ওঠে সুন্দর জনপদ। একসঙ্গে বাস্তবায়ন করি, একসঙ্গে সমৃদ্ধ হই, একসঙ্গে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করি।’ এদিকে দেশের পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

দেশের ৮৪ শতাংশ এলাকা পরিকল্পনার বাইরে

বাংলাদেশের মোট আয়তন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬১০ বর্গকিলোমিটার। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে মাত্র ২৩ হাজার ২৯ বর্গকিলোমিটার বা ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ এলাকার জন্য মহাপরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ এলাকা এখনো পরিকল্পনার বাইরে।

মহাপরিকল্পনার আওতাভুক্ত এলাকার মধ্যে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে রয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৬৬৪ বর্গকিলোমিটার। রাজউকসহ পাঁচটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় রয়েছে ৬ হাজার ৩৬১ বর্গকিলোমিটার। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন ২১৬টি পৌরসভায় রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা।

কাগজেই সীমাবদ্ধ অনেক মাস্টারপ্ল্যান

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ২৫০টি পৌরসভার মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। পাঁচটি প্রকল্পে এ জন্য ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। তবে গেজেট প্রকাশের আগেই পরিকল্পনাগুলোর নির্ধারিত বাস্তবায়নকাল শেষ হয়ে যায়।

শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও সখীপুরের জন্য ২০১১ থেকে ২০৩১ মেয়াদি মহাপরিকল্পনা থাকলেও সেগুলোরও কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়ন হয়নি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা ছাড়াই বিভিন্ন এলাকায় আলাদাভাবে মহাপরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। এর অনেকগুলোই কাগজে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ভবন নির্মাণের ছাড়পত্র দেওয়া হলেও সড়ক, খাল ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি হয়নি।

ছোট শহরেও বাড়ছে নগরায়ণের চাপ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে দেশের ২৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ মানুষ নগর এলাকায় বাস করত। ২০২২ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশে। ছোট শহরগুলোর আশপাশে অপরিকল্পিত বসতি গড়ে ওঠায় পৌরসভার সীমানার বাইরেও নাগরিক সুবিধার চাহিদা বাড়ছে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা এসএনভির এক গবেষণায় দেখা গেছে, সিলেটে জলাভূমি কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে শহরটিতে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

বড় শহরগুলোতেও অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার ঘাটতি রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার মাত্র ২০ শতাংশ বাসিন্দার পাইপভিত্তিক পয়োনিষ্কাশন সংযোগ রয়েছে। আর কার্যকর পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা পান মাত্র ২ শতাংশ মানুষ।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১৬-২০২০) দেশে প্রায় ৫৭০টি নগরের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২০০৫ সালের গ্রামীণ সড়ক মহাপরিকল্পনায় ২ হাজার ১০০টি গ্রোথ সেন্টারের হিসাব দেওয়া হয়। এসব গ্রোথ সেন্টার গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।

জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ

দেশের পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকার জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এই পরিকল্পনায় কোথায় নগর ও শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে, কোথায় কৃষিজমি ও জলাশয় সংরক্ষণ করা হবে—তার দিকনির্দেশনা থাকবে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় নগর নীতিমালা-২০২৫ অনুমোদন করে সরকার। এরপর ১০ এপ্রিল কার্যকর হয় স্থানিক পরিকল্পনা আইন-২০২৬। এ আইনের অধীনে জাতীয় ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্ব পেয়েছে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর। গত জুলাইয়ে জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা পরিষদ ও আন্তমন্ত্রণালয় কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. মাহমুদ আলী বলেন, আগে মহাপরিকল্পনা লঙ্ঘন করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও শাস্তির বিধান ছিল না। নতুন আইনে পরিকল্পনা অমান্য করে নির্মাণকাজ করলে তা বন্ধ ও উচ্ছেদের বিধান রাখা হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নগরের বাসযোগ্যতা বাড়বে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, নগরের সমস্যা সমাধানে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের উন্নয়নকেও পরিকল্পনার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। গ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে শহরমুখী মানুষের চাপ অনেকটাই কমবে।