নাইমুল রাজ্জাক:

সময়- একটি অদৃশ্য অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী বাস্তবতা। আমরা তাকে ছুঁতে পারি না, কিন্তু তার স্পর্শে প্রতিটি মুহূর্ত বদলে যায়। একসময় সময় ছিল জীবনযাপনের প্রাকৃতিক প্রবাহ। আজ তা পরিণত হয়েছে এক প্রকার পণ্যে যা কেনা-বেচা করা যায়, হিসাব করা যায়, এমনকি বিনিয়োগও করা যায়।

আধুনিক জীবনে সময় আর শুধুই সময় নয়- এটি এখন “মূল্য”। আমরা বলি, “সময় মানেই টাকা।” এই একটি বাক্যই সময়ের দর্শনকে বদলে দিয়েছে। আগে মানুষ সময়ের সাথে বাঁচতো, এখন মানুষ সময়কে কাজে লাগাতে শেখে, সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, এমনকি সময়কে বিক্রি করতেও প্রস্তুত।

citytouch 728-X-90

কর্মজীবনের প্রতিটি ঘণ্টা এখন নির্দিষ্ট অর্থমূল্যে পরিমাপ করা হয়। একজন শ্রমিক তার শ্রম বিক্রি করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে বিক্রি করে তার সময়। একজন শিক্ষক ক্লাস নেন নির্দিষ্ট সময়ের বিনিময়ে, একজন ফ্রিল্যান্সার কাজ করেন ঘণ্টা ধরে—সব ক্ষেত্রেই সময়ই মূল মুদ্রা। এখানেই শুরু হয় সময়ের বাণিজ্যিকীকরণ। সময় আর ব্যক্তিগত নয়, এটি হয়ে উঠেছে পণ্য। ডিজিটাল যুগে এই প্রবণতা আরও গভীর। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সময়কে কনটেন্টে রূপান্তর করে, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সময়কে উৎপাদনশীলতার মাপকাঠিতে পরিণত করে। আমরা যত বেশি সময় দেই, তত বেশি মূল্য তৈরি হয়—কিন্তু সেই মূল্য সবসময় আমাদের কাছে ফিরে আসে না।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সময়ের এই বাণিজ্যিকীকরণ জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। অবসর, অনুভূতি, সম্পর্ক- সবকিছুই যেন সময়ের হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে কল্পনা করা যায় এক অদ্ভুত জগৎ—“সময় বিক্রয় কেন্দ্র”। কারণ, বাস্তবে আমরা প্রতিদিনই আমাদের সময় বিক্রি করছি শুধু নামটা ভিন্ন। সম্ভবত সময়ের প্রকৃত দর্শন এখানেই- সময়কে আমরা যতই নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, শেষ পর্যন্ত সময়ই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। তাই সময়কে শুধু বিনিয়োগ বা ব্যয়ের দৃষ্টিতে না দেখে, তাকে অনুভব করা, তাকে উপভোগ করা-এই বোধই হয়তো আমাদের মানবিকতার আসল চিহ্ন।

নাইমুল রাজ্জাকলেখক,গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক