প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৭৬ টাকা নির্ধারণ করেছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড। জাতীয় গ্রিডের আওতাধীন এলাকায় বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা। সে হিসাবে সেন্টমার্টিনে বিদ্যুতের দাম প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।

নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, দ্বীপের আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৬৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৬ টাকা করা হয়েছে। নতুন এ মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অভিযোগ, এত বেশি দাম দিয়েও দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম। একই সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ বয়কটের ঘোষণা দিয়েছেন।

সরকারি মূল্যহার অনুযায়ী, সারা দেশে সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের প্রথম ৭৫ ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা। পরবর্তী ধাপগুলোতে এ দাম ৮ টাকা ৫০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। আর বাণিজ্যিক ও অফিসের গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা।

তবে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে থাকায় সেন্টমার্টিনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত সাধারণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক বিদ্যুতের মূল্যহার প্রযোজ্য নয়। বিদ্যুৎ বিভাগের সৌর মিনি-গ্রিড নির্দেশিকা অনুযায়ী, বিচ্ছিন্ন এলাকায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের সুযোগ রয়েছে।

একসময় সেন্টমার্টিনে ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে সীমিত সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। পরে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হয়। দ্বীপের বাসিন্দা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দিনরাত বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।

প্রকল্পের আওতায় ৯২৫টি সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি ৪৬৫টি বৈদ্যুতিক খুঁটির মাধ্যমে দ্বীপে প্রায় সাড়ে ১৫ কিলোমিটার বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থায়ন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রকল্প চালুর পর প্রথম দিকে বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। তখন আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিটের দাম ছিল ৩২ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৪২ টাকা। পরে কয়েক দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকদের না জানিয়েই দাম বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

গ্রাহকদের আরও অভিযোগ, বিদ্যুতের বিল রিচার্জের সময় বিভিন্ন খাতে টাকা কেটে রাখা হয়। এক হাজার টাকা রিচার্জ করলে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত কেটে নেওয়া হয়। কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তার স্পষ্ট হিসাবও দেওয়া হয় না। ফলে প্রকৃতপক্ষে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কত পড়ছে, তা বুঝতে পারছেন না গ্রাহকেরা।

দ্বীপের ব্যবসায়ী মৌলভী আবু তাহের বলেন, সেন্টমার্টিনে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বর্ষায় দ্বীপবাসী বিদ্যুৎ সংকটে ভুগেছেন। ইডকলের মাধ্যমে সরকারের সহায়তায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হলেও এখন অতিরিক্ত দামের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে দ্বীপে সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিট ৭৪ থেকে ৮২ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এ ব্যয় স্থানীয়দের পক্ষে বহন করা কঠিন। বাংলাদেশের অংশ হিসেবে দ্বীপে সরকারিভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা চান তাঁরা।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছৈয়দ আলম বলেন, প্রকল্পের প্রথম দুই বছর বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি ভালো ছিল। কিন্তু এরপর থেকে দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায়নি। বাকি সময় সরবরাহ বন্ধ থাকে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে দ্বীপের মানুষ প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে পিডিবির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলে স্থানীয়রা স্বাগত জানাবেন। প্রয়োজনে দ্বীপে কেবল স্থাপন করে বিদ্যুৎ আনা যেতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থাপনার ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমেও সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব।

ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠকেও বাড়তি দামে বিদ্যুৎ না নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি চাইলে তাদের বিদ্যুৎ সরিয়ে নিতে পারে। দ্বীপবাসীর সুবিধার্থে সরকারিভাবে পিডিবির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তিনি আরও জানান, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে। দ্বীপবাসীর প্রতিনিধি হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ বয়কটের ঘোষণা দিয়েছেন।

তবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ও সরবরাহ সংকটের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির সেন্টমার্টিন কার্যালয়ের প্রকৌশলী মোহাম্মদ শিহাব বলেন, প্রকল্প স্থাপনের সময় দ্বীপে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কম ছিল। বর্তমানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল শুরু হওয়ায় চাহিদা বেড়েছে। ফলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, পর্যটন মৌসুমে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা বাড়ানো হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার মো. রফিকুল ইসলামও প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড প্রশাসনকে কিছু জানায়নি। স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দাম বাড়ানোর কথা জানিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে।