অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম তুহিন তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে কাজ করতেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রায় এক মাস আগে নেশাদ্রব্য কেনার জন্য অপ্রতিমের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নেন তুহিন। পরে ওই টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর পাওনা টাকা ফেরত নিতে তুহিনের সঙ্গে দেখা করে অপ্রতিম। টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে তুহিন তাকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের লালমাই পাহাড়ের দিকে নিয়ে যান। সেখানে টাকা দেওয়া নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তুহিন টাকা দিতে পারবেন না বলে জানালে অপ্রতিম তাকে ধাক্কা দেয়। পরে তুহিন বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথার পেছনে কয়েকবার আঘাত করেন বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন।
এ সময় সেখানে আরও তিন-চারজন উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। অপ্রতিম আহত হওয়ার পর তার সঙ্গে থাকা আইফোন নিয়ে তুহিন ও তার সহযোগীরা সেখান থেকে চলে যান।
অন্যদিকে, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাকে খুঁজতেও দেখা যায় তুহিনকে। শনিবার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের সময়ও তুহিনসহ কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড নিয়ে একাধিক ভিডিওও শেয়ার করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের বাবার করা হত্যা মামলায় তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তুহিন হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে অন্যদের নাম প্রকাশে তিনি অনীহা দেখান।
তদন্তকারীরা জানান, শনিবার সকাল ৯টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তখনও কর্মকর্তারা জানতেন না যে অপ্রতিমের মৃত্যু হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার মরদেহ উদ্ধারের খবর পান তারা।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় তুহিনের মোবাইল ফোনে বারবার ফোন আসছিল। ফোনকারী অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা আরেক কিশোরকে শনাক্ত করে হেফাজতে নেয় পুলিশ। ওই সময় তার পরনে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল। পরে তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও একজনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়।
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে অপ্রতিমের যোগাযোগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা জানিয়েছেন, তুহিন অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘কিং অব কোটবাড়ি’ কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্যের দাবি, প্রায় এক বছর ধরে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের পরিচয় ও যোগাযোগ ছিল।
ওই সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের বাসায় নিয়মিত পার্টি হতো। তারা মোটরসাইকেলে করে লালমাই পাহাড় এলাকায় ঘুরত এবং স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সঙ্গে আড্ডা দিত। তুহিন ওই গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
রাইজিংবিডির অনুসন্ধানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ‘কিং অব কোটবাড়ি’ নামের ওই গ্রুপের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। গ্রুপটির একাধিক ছবিতে অপ্রতিমকে দেখা গেছে। কিশোরদের মোটরসাইকেল মহড়ার ছবিতেও তার উপস্থিতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ওই গ্রুপের দেখভালের অভিযোগও উঠেছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রতিশোধের বিষয়টিও খতিয়ে দেখার দাবি
অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন ড. কামরুন নাহাত শীলা।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজিত মানববন্ধনে তিনি বলেন, নাহিদা বেগম চান পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখুক—কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো প্রতিশোধের জেরেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে কি না।
তবে এ বিষয়ে এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
যেভাবে উদ্ধার হয় অপ্রতিমের মরদেহ
শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বেলা আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার বেলা ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য ও অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।










