কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলায় পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের বন্দিশালা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে যৌথ বাহিনী। শুক্রবার সকালে তাঁদের টেকনাফ মডেল থানায় নেওয়া হয়। সেখানে তাঁরা পাচারকারীদের হাতে আটকে থাকা, নির্যাতন ও সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনার বর্ণনা দিয়েছেন।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, উদ্ধার ব্যক্তিদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ৫৭ জন উদ্ধারের কথা জানানো হলেও যাচাইয়ে একজনকে দালাল হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। অভিযানে আটক আরও পাঁচজনকে পরে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও জানান তিনি।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের যৌথ অভিযান চলে। এ সময় মানবপাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য তিতাস শেখ আহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। অভিযানস্থল থেকে পাঁচজনকে আটক করার পাশাপাশি একটি পিস্তল, একটি দেশীয় বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
আট দিন বন্দি থাকার অভিযোগ
উদ্ধার হওয়া ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান জানান, তাঁকে কাজ দেওয়ার প্রলোভনে ডেকে নিয়ে পাহাড়ের একটি ঝুপড়িতে আট দিন আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, সেখানে ৪০–৫০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি পাহারা দিত। পালানোর চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি।
আসাদুজ্জামানের ভাষ্য, তাঁর মোবাইল ফোনসহ জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়। পরে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। অভিযান চালিয়ে যৌথ বাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।
উখিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইফুল ও মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, কাজের কথা বলে তাঁদের মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কেনা হয়েছে। তাঁদের দাবি, পালানোর চেষ্টা করলে মারধর করে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। দিনে দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো এবং তাঁদের সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল।
পাহাড়ে অভিযান জোরদারের দাবি
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও জোরালো অভিযান প্রয়োজন।
আইনজীবী মো. তৌহিদুল এহেছান বলেন, টেকনাফে মানবপাচার, মাদক, চোরাচালান, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধ দীর্ঘদিনের সমস্যা। তাঁর মতে, যৌথ বাহিনীর অভিযান সময়োপযোগী হলেও এতে একজন সেনাসদস্যের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম অনীক চৌধুরী জানান, পাহাড়ে সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ দমনে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
এদিকে, ফরিদপুরের নগরকান্দার লস্করদিয়া গ্রামে সেনাসদস্য তিতাস শেখের মৃত্যুতে শোকের মাতম চলছে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।









