যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি এশিয়ার বড় বাজারগুলোতেও বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এশীয় বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দেশের রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে দেশটিতে ২২ কোটি ৫৪ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২০ কোটি ৬১ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

দক্ষিণ কোরিয়াতেও বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে দেশটিতে রপ্তানি ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৩ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ১২ কোটি ৫৪ লাখ ১০ হাজার ডলারের পণ্য।

citytouch 728-X-90

ভারতের বাজারেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৫১ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। গত বছরের একই সময়ে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছিল ৪৮ কোটি ৩৭ লাখ ১০ হাজার ডলারের পণ্য।

এশিয়ার আরেক গুরুত্বপূর্ণ বাজার জাপানেও বাংলাদেশের রপ্তানি সামান্য বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশটিতে ৩৯ কোটি ৯১ লাখ ১০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩৯ কোটি ৬১ লাখ ১০ হাজার ডলার।

সামগ্রিক রপ্তানিতেও প্রবৃদ্ধি

এশিয়ার বাজারগুলোতে রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতেও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ২৩১ কোটি ডলার।

বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার বাজারে রপ্তানি বাড়ার ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার ও নতুন পণ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করছে। এর ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি এশিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

চীনে বড় সম্ভাবনা

চীনকে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির বিশাল ভোক্তা বাজার ও ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি পোশাকের বাইরে বিভিন্ন নতুন পণ্যের বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।

চীনের বাজারে পণ্য বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে রপ্তানিকারকদের নতুন পণ্যের সম্ভাবনা খুঁজে বের করার পাশাপাশি ভোক্তাদের চাহিদা ও বাজারের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

চীনের বিভিন্ন বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণও বাড়ছে। এসব আয়োজনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা পণ্য প্রদর্শনের পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

ভারতের বাজারেও সুযোগ

ভৌগোলিক নৈকট্য এবং বিশাল ভোক্তা বাজারের কারণে ভারত বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রপ্তানি বাজার। দুই দেশের সীমান্তবর্তী বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা গেলে রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে ভারতের বাজারে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা এখনো বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব প্রতিবন্ধকতা কমানো গেলে দেশটিতে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে নতুন পণ্যের সম্ভাবনা

দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, জুতা, পাটজাত পণ্য, গৃহসজ্জার বস্ত্র, ওষুধ ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

জাপানের বাজারেও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, পাটজাত পণ্য, গৃহসজ্জার বস্ত্র, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের চাহিদা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

এশিয়ার এসব বাজারে রপ্তানি বাড়াতে পণ্যের মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের চাহিদা, মানদণ্ড ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি। একই সঙ্গে সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

বহুমুখীকরণে জোর

বাংলাদেশের রপ্তানি খাত দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকনির্ভর। তাই নতুন বাজারের পাশাপাশি নতুন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলোতে পণ্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।

বাণিজ্য মেলা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল, বাজার অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন প্রচারমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে রপ্তানিকারকদের নতুন বাজার খুঁজে পেতে সহায়তা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি পণ্যের গুণগত মান, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, দ্রুত সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে পারলে এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো বড় এশীয় বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির সাম্প্রতিক প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এশিয়ার বাজারে পণ্য ও রপ্তানি গন্তব্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারলে ভবিষ্যতে দেশের রপ্তানি খাতে নতুন গতি তৈরি হতে পারে।