হাসপাতালের বিছানায় নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছেন মিরাজ। শরীরে জ্বর, সঙ্গে বমি ও প্রচণ্ড দুর্বলতা। রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়েছে প্লাটিলেটও কমে গেছে। ছেলের মাথার পাশে বসে কখনো কপালে হাত রাখছেন, কখনো চোখ মুছছেন মা রিজিয়া বেগম। সন্তানের অসুস্থতা যেন তাঁর নিজের শরীরেও ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় হাসপাতালের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে তাঁর।

চট্টগ্রামে কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন রাজমিস্ত্রি মিরাজ। সেখানে গিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর বাড়িতে ফিরিয়ে এনে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছে ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ছেলের পাশে বসে রিজিয়া বেগম বলছিলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পোলাডা বাড়িতে চলে আসছে। পরে হাসপাতালে ভর্তি করাই। কিছুই খেতে পারে না, খেলেই বমি করে। আমার ছেলের অবস্থা খুবই খারাপ। রক্ত পরীক্ষায় জানা গেছে, রক্তে প্লাটিলেটও অনেক কম।’

কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই মা। সন্তানের অসুস্থতার চেয়েও এখন বড় হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তা—কখন সুস্থ হয়ে আবার মায়ের পাশে ফিরবে তাঁর ছেলে।

citytouch 728-X-90

মিরাজের বাবা কামাল রাঢ়ি জানান, তাঁদের বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার ভেলুমিয়া ইউনিয়নে। চট্টগ্রামে কাজে যাওয়ার মাত্র আট দিনের মাথায় মিরাজের জ্বর শুরু হয়। এর সঙ্গে শরীর ব্যথা, বমিসহ ডেঙ্গুর বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিলে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে এনে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মিরাজের মতো একই পরিস্থিতির মুখোমুখি চট্টগ্রামফেরত বৃদ্ধ মোজ্জাম্মল বেপারীর পরিবারও। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়াসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঠেকাতে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেছেন চিকিৎসকেরা।

কিন্তু উন্নত চিকিৎসার খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই পরিবারের। ফলে একদিকে বাবার অসুস্থতা, অন্যদিকে অর্থের সংকট—দুই দুশ্চিন্তায় দিশেহারা তাঁর স্বজনেরা।

মোজ্জাম্মল বেপারীর মেয়ে আকলিমা বেগম বলেন, সম্প্রতি তাঁর বাবা চট্টগ্রামে বড় ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তিন দিন আগে বাড়ি ফেরার পর জ্বর ও শরীর ব্যথাসহ নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখন চিকিৎসকেরা উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে সেই চিকিৎসা করানো নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শুধু শ্রমিক কিংবা বয়স্ক মানুষ নন, রাজধানী ও বন্দরনগরী থেকে ভোলায় ফেরা বিভিন্ন বয়সী মানুষও ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। ঢাকায় ডাব বিক্রি করেন মো. হোসেন। চার দিন আগে হঠাৎ প্রচণ্ড জ্বর ও মাথাব্যথা শুরু হলে তিনি গ্রামের বাড়ি ভোলায় ফিরে আসেন। পরে ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়ে পরীক্ষার পর জানতে পারেন, তিনি ডেঙ্গু আক্রান্ত।

মো. হোসেন বলেন, ‘ঢাকায় আমি ডাব বিক্রি করি। সেখানে ব্যাচেলর থাকি। হঠাৎ প্রচুর জ্বর ও মাথাব্যথা শুরু হওয়ার পর ভোলায় গ্রামের বাড়িতে চলে আসি। হাসপাতালে পরীক্ষা করার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। বুঝতে পারছি, ঢাকাতেই সম্ভবত আক্রান্ত হয়েছি।’

এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও। ১০ মাসের শিশু থেকে মাদরাসাছাত্র—বাদ যাচ্ছে না কেউই। অভিভাবকদের কেউ কেউ বলছেন, রাতে শিশুদের মশারির ভেতরে রাখার পরও তারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত ১০ মাস বয়সী রাফির মা লাইজু আক্তার জানান, তিন দিন ধরে তাঁর ছেলের জ্বর ছিল। জ্বর না কমায় হাসপাতালে এনে পরীক্ষা করানো হয়। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রাতে মশারির ভেতরে রাখার পরও কীভাবে সন্তান ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলো, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি।

ভোলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরকে ডেঙ্গুর মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে প্রায় ৭০০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩০০। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, স্থানীয়ভাবে আক্রান্তের পাশাপাশি বাইরে থেকে ডেঙ্গু নিয়ে ভোলায় ফেরা মানুষের সংখ্যাই বেশি। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে ফেরা রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে বেশি। ফলে দ্বীপজেলায় ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে স্থানীয় পর্যায়ে মশক নিধনের পাশাপাশি বাইরে থেকে আসা আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আরাফাতুর রহমান বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিনই নতুন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভোলায় ফিরে এসেছেন।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। কারও অতিরিক্ত জ্বর, শরীর ব্যথা কিংবা ডেঙ্গুর অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন তিনি। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে বলেও জানান এই চিকিৎসক।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ঝুঁকি এড়াতে রোগীর শারীরিক অবস্থার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।

ভোলার সিভিল সার্জন ডা. মু. মনিরুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ডেঙ্গুর মৌসুম চললেও বরিশাল বিভাগের অন্যান্য জেলার তুলনায় ভোলার পরিস্থিতি বর্তমানে সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি জানান, সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও চলতি বছর এখন পর্যন্ত ভোলায় ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে আক্রান্তদের বড় একটি অংশ ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে ডেঙ্গু নিয়ে ভোলায় ফিরেছেন।

ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষিত থাকতে বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি জমে থাকা পানি অপসারণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সিভিল সার্জন। কারও শরীরে ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে বিনামূল্যে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

ভোলার হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে এখন তাই শুধু রোগীর সংখ্যা গোনা হচ্ছে না; গোনা হচ্ছে স্বজনদের উৎকণ্ঠার রাতও। দূর শহর থেকে জ্বর নিয়ে ফেরা মানুষগুলোর সঙ্গে বাড়িতে ফিরছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক—ডেঙ্গু। আর সেই আতঙ্কের সামনে প্রতিদিন লড়াই করছেন চিকিৎসক, রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।