জীবাণুমুক্তকরণ ও জিন প্রযুক্তির যুগান্তকারী অগ্রগতি ‘ক্রিসপার-ক্যাস৯’ (CRISPR/Cas9) প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানবদেহ থেকে এইচআইভি (HIV) ভাইরাস নির্মূলের সম্ভাবনা তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এই গবেষণা বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে দুরারোগ্য হিসেবে পরিচিত এইচআইভি সংক্রমণের বিরুদ্ধে এটি ভবিষ্যতে কার্যকর সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

গবেষণার মূল ভিত্তি হলো ‘জিনের কাঁচি’ নামে পরিচিত CRISPR/Cas9 প্রযুক্তি। ২০১৮ সালে বিজ্ঞানী ইমানুয়েল শারপঁতিয়ে ও জেনিফার ডুডনা এই প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেন। জিন সম্পাদনার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক অবদানের জন্য তারা ২০২০ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জীবন্ত কোষের ডিএনএ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কেটে পরিবর্তন বা অপসারণ করা সম্ভব হয়।

বার্সেলোনাভিত্তিক একদল গবেষক এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের আক্রান্ত কোষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এইচআইভির জেনেটিক উপাদান শনাক্ত ও অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, CRISPR/Cas9 প্রযুক্তি ভাইরাসের ডিএনএ কেটে বাদ দিতে পারে, ফলে আক্রান্ত কোষে ভাইরাসের বিস্তার বন্ধ হয়ে যায়।

citytouch 728-X-90

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইচআইভি ভাইরাসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কোষ বিশেষ করে টি-সেল ও ম্যাক্রোফেজ আক্রমণ করে নিজের জেনেটিক কোড সেখানে লুকিয়ে রাখতে পারে। এ কারণে প্রচলিত অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও একে পুরোপুরি নির্মূল করতে পারে না। ফলে রোগীদের সারা জীবন ওষুধের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়।

তবে নতুন এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, জিন সম্পাদনার মাধ্যমে ভাইরাসের লুকিয়ে থাকা ডিএনএ অপসারণ করা গেলে ভবিষ্যতে এইচআইভি সম্পূর্ণ নিরাময়ের পথ খুলে যেতে পারে। যদিও গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। গবেষণাগারে কোষের ওপর সফল ফল পাওয়া গেলেও মানবদেহে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রয়োজন রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এখনও কোটি কোটি মানুষ এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত। প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ এই রোগের কারণে মৃত্যুবরণ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে CRISPR/Cas9 প্রযুক্তির এই অগ্রগতি চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এইচআইভি রোগীদের জন্য শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, সম্পূর্ণ সুস্থতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।