রাশিয়ার একটি প্লেগ গবেষণাগারে কর্মরত ২৮ বছর বয়সী এক গবেষকের নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে নিউমোনিক প্লেগ। প্লেগের এই ধরনকে রোগটির সবচেয়ে গুরুতর ও প্রাণঘাতী রূপগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য এ রোগের ঝুঁকি কম বলেই মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
নিউমোনিক প্লেগ ‘ইয়েরসিনিয়া পেস্টিস’ নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়। এটি ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটিয়ে দ্রুত গুরুতর নিউমোনিয়া তৈরি করতে পারে। প্লেগের আরও দুটি পরিচিত ধরন হলো বুবোনিক ও সেপ্টিসেমিক প্লেগ। বুবোনিক প্লেগ সাধারণত আক্রান্ত মাছির কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। অন্যদিকে সেপ্টিসেমিক প্লেগে ব্যাকটেরিয়া রক্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
নিউমোনিক প্লেগের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো এটি আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সরাসরি অন্য মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বের হওয়া শ্বাসতন্ত্রের ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তি সংক্রমিত হতে পারেন। আক্রান্ত প্রাণীর নিঃসরণ থেকেও সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
মানুষ থেকে মানুষে নিউমোনিক প্লেগ সংক্রমণের ঘটনা বর্তমানে অত্যন্ত বিরল। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের সংক্রমণের সর্বশেষ নথিভুক্ত ঘটনা ১৯২৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে ঘটেছিল।
নিউমোনিক প্লেগে আক্রান্ত হলে খুব দ্রুত উপসর্গ দেখা দিতে পারে। জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, বমি, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্ট এর অন্যতম লক্ষণ। ফুসফুসে সংক্রমণ গুরুতর পর্যায়ে গেলে রোগীর শ্বাস নিতে মারাত্মক সমস্যা হতে পারে। চিকিৎসা না করা হলে রোগটি দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
তবে সময়মতো রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা গেলে নিউমোনিক প্লেগের চিকিৎসা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। গুরুতর অবস্থায় রোগীকে অক্সিজেন, তরল ও অন্যান্য সহায়ক চিকিৎসাও দেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেরি হলে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
রাশিয়ার গবেষণাগারে গবেষকের মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে পর্যবেক্ষণ ও কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের জন্য জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি কম বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে আক্রান্ত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা, শরীরের তরল থেকে দূরে থাকা এবং নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করার মতো সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো ব্যক্তি সংক্রমণের সংস্পর্শে এলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিরোধমূলক অ্যান্টিবায়োটিকও দেওয়া যেতে পারে।
চতুর্দশ শতকের ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারিতে ইউরোপে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে বর্তমানে প্লেগ অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তবে রোগটির জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো বিদ্যমান। ফলে নিউমোনিক প্লেগের মতো গুরুতর সংক্রমণের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।










