সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মাত্র ছয় শব্দের একটি পোস্ট অভিজিৎ দীপকের জীবন বদলে দেয়। মে মাসে হতাশা থেকে দেওয়া ওই ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট কয়েক দিনের মধ্যেই বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার জন্ম দেয়। সেই সূত্র ধরেই আলোচনায় আসে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।
৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম এবং সরকারের জবাবদিহির দাবিতে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে উঠে আসেন। অনলাইনভিত্তিক প্রচার থেকে রাজপথের কর্মসূচিতে পৌঁছানো এই আন্দোলন ভারতের তরুণদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি করেছে বলে দাবি এর সমর্থকদের।
একটি মন্তব্য থেকেই শুরু
ঘটনার সূত্রপাত মে মাসে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। ওই বক্তব্যে বেকার তরুণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু মানুষকে ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। পরে তিনি বক্তব্যটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানান।
এরপর ১৬ মে অভিজিৎ দীপকে এক্সে লেখেন, ‘সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে হয়?’ ব্যঙ্গাত্মক এই পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দিল্লির ইউটিউবার মেঘনাদ এসসহ কয়েকজন কনটেন্ট নির্মাতা বিষয়টিকে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি করা হয় ককরোচ জনতা পার্টির ব্যঙ্গাত্মক ওয়েবসাইট এবং অনলাইনে শুরু হয় সদস্য সংগ্রহ।
কয়েক দিনের মধ্যে প্ল্যাটফর্মটি ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং গণমাধ্যমের মালিকানার মতো বিষয়ও আলোচনায় আসে।
দীপকের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতো কোনো সংগঠন নয়; বরং মূলধারার রাজনীতিতে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে না পারা তরুণদের জন্য একটি স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম।
কে এই অভিজিৎ দীপকে?
অভিজিৎ দীপকের জন্ম ১৯৯৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদে। দলিত সম্প্রদায়ের একটি নিও-বৌদ্ধ পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর বাবা ভগবানরাও দীপকে মহারাষ্ট্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী এবং মা অনিতা দীপকে গৃহিণী।
শিক্ষাজীবনের শুরুতে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করলেও পরে তিনি সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগের দিকে ঝুঁকে পড়েন। পুনেতে পড়াশোনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটির কলেজ অব কমিউনিকেশন থেকে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম, ব্যঙ্গ ও সহজ ভাষায় রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরার মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পান। তরুণদের কাছে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করাই তাঁর যোগাযোগকৌশলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আম আদমি পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন
২০২০ সালে অভিজিৎ দীপকে আম আদমি পার্টির (এএপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দলের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে মিমনির্ভর ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে তিনি ভূমিকা রাখেন।
পরে দিল্লি সরকারের শিক্ষা বিভাগের যোগাযোগ উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন। ২০২৩ সালে এএপির মিডিয়া টিম থেকে সরে গিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরবর্তী সময়ে ককরোচ জনতা পার্টির কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি নতুন করে আলোচনায় আসেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন প্ল্যাটফর্মটি নিজেদের কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের অংশ নয় বলে পরিচয় দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে দিল্লির রাজপথে
অনলাইনে আন্দোলনের পরিচিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিজিৎ দীপকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথাও জানান। তবে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি ভারতে ফিরে আসেন বলে জানা যায়। জুনে বোস্টন থেকে ভারতে ফেরার পর তাঁর হাতে বি আর আম্বেদকরের আত্মজীবনী দেখা যায়। দলিত অধিকার, সামাজিক সমতা ও সংবিধানভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে আম্বেদকরের চিন্তার সম্পর্ক রয়েছে।
এরপর দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির রাজপথের কর্মসূচি শুরু হয়। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দায় নির্ধারণ এবং সরকারের জবাবদিহির মতো দাবি সামনে আসে।
আন্দোলন চলাকালে দীপকে কখনো মঞ্চে বক্তব্য দেন, কখনো গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
রাজপথে সংঘাত ও আন্দোলনের মোড়
২০ জুলাই হাজারো আন্দোলনকারী সংসদের দিকে মিছিল করার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ সময় কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের ঘটনাও ঘটে। আন্দোলনকারী ও পুলিশ সদস্যদের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
এরপর দীপকে জানান, অবস্থান কর্মসূচি চালু থাকলেও অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নতুন করে রাজপথের মিছিল স্থগিত রাখা হবে।
এর কয়েক দিনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের খবর সামনে আসে। ২৫ জুলাইয়ের এই ঘটনাকে আন্দোলনের সমর্থকেরা নিজেদের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখেন। তবে পদত্যাগের সঙ্গে আন্দোলনের সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা নির্ধারণে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।
শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে আরও যেসব দাবি
ককরোচ জনতা পার্টির কার্যক্রম শুরুতে শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও পরে এর আলোচ্য বিষয় বাড়তে থাকে। তরুণদের কর্মসংস্থান, রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব, বিচারপতিদের অবসর-পরবর্তী রাজনৈতিক নিয়োগ, গণমাধ্যমের মালিকানা এবং সরকারের জবাবদিহির মতো বিষয়ও এতে যুক্ত হয়।
দীপকে বিভিন্ন বক্তব্যে বলেছেন, তাঁদের লক্ষ্য কেবল সরকার পরিবর্তন নয়; বরং ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। আন্দোল










