ভারতে ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের এই উদ্যোগে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির নির্বাচন কমিশন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলো অভিযোগ তুলেছে, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনে অন্যায্য সুবিধা পেতে পারে।
বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে। শনিবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে এ দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। তবে পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের দাবি, দলটির শীর্ষ নেতাসহ অনেক সমর্থককে আটক করা হয়েছে।
বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা কারচুপি ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
কেন বিক্ষোভ করছেন আন্দোলনকারীরা?
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা যাচাইয়ের সময় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারকে মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, ৬ কোটি ৩০ লাখ ভোটার অন্যত্র চলে গেছেন, প্রায় ১ কোটি নাম একাধিকবার থাকার কারণে বাদ পড়েছে এবং ৩০ লাখ ভোটারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কমিশন।
তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটাররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের দাবি, বিজেপিকে সমর্থন করার সম্ভাবনা কম—এমন ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি এবং বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিরোধীদের মতে, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনা সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে। এতে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, বিজেপির বক্তব্য, দলটির নির্বাচনি সাফল্যের পেছনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার উদ্বেগ প্রকাশের খবর সামনে আসার পর বিতর্ক আরও জোরালো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রায় ১০ মাসে তাঁরা অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো আইন মেনেই নেওয়া হয়েছে।
বিজেপি বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে বৈধ নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা দুর্বল করার অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে, বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে।
আগামী রাজ্য নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
আগামী বছর ভারতের অন্তত সাতটি রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে উত্তর প্রদেশ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির সবচেয়ে জনবহুল এই রাজ্যের নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে।
উত্তর প্রদেশে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশোধনের ফলে রাজ্যটির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। যাঁদের নাম তালিকায় নেই, তাঁদের পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হতে পরিচয় ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক ভোটার অভিযোগ জানিয়েছেন।
বিরোধী দলগুলোর আশঙ্কা, ভোটার তালিকা সংশোধনের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার হারাতে পারেন। বিশেষ করে বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া জটিল বা দীর্ঘ হলে তাঁরা আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দলগুলো।
কোন কারণে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়?
নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো ভোটারের মৃত্যু হলে, একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার তালিকায় থাকলে, তিনি অন্য এলাকায় চলে গেলে অথবা তাঁকে খুঁজে পাওয়া না গেলে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হতে পারে। কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, নাম বাদ দেওয়ার কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নথিভুক্ত করতে হয়।
খসড়া ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারেন। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের সুযোগও রয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা যায়। ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ভোট দিতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আপিলে সফল হতে হবে অথবা নিয়ম অনুযায়ী নতুন করে নিবন্ধন করতে হবে।
তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বাদ পড়া অনেক ভোটার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তালিকায় নাম ফেরাতে পারবেন না। ফলে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে তারা দাবি করছে।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতারা তাঁকে পদ থেকে সরানোর উদ্যোগ নিলেও পার্লামেন্টে তা খারিজ হয়ে যায়।
রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের জবাবে জ্ঞানেশ কুমার বিরোধী দলগুলোকে তাদের অভিযোগ হলফনামার মাধ্যমে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইন ও নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে।
এদিকে, ২০২৩ সালে মোদি সরকারের পাস করা একটি আইনে নির্বাচন কমিশনের প্রধানকে দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের সময় করা কাজের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সমালোচনার মুখে নির্বাচন কমিশন তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নথিপত্র সংগ্রহ ও তথ্য যাচাই করতে কর্মকর্তাদের বাড়ি বাড়ি যাওয়া এবং কয়েকটি রাজ্যে চূড়ান্ত যাচাইয়ের সময়সীমা বাড়ানো।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে চলমান বিতর্ক এখন ভারতের নির্বাচনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আগামী রাজ্য নির্বাচনগুলোর আগে এ বিতর্ক কোন দিকে যায়, তা নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক মহলে বাড়ছে আগ্রহ।










