জার্মানিতে বসবাসকারী জনপ্রিয় ভারতীয় ইউটিউবার ও ভিডিও নির্মাতা ধ্রুব রাঠী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত। রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস ও সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে তথ্যভিত্তিক ভিডিও তৈরি করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি। সম্প্রতি ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে ককক্রোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনে যোগ দিতে দিল্লিতে এসে আলোচনায় আসেন তিনি।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬ এলাকায় নিজের বাসা থেকে ধ্রুব রাঠীকে আটক করে পুলিশ। পরে অধিকাংশ আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হলেও তাঁকে কিছু সময় হেফাজতে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকেও মুক্তি দেওয়া হয়। তবে আবার সিজেপির বিক্ষোভে যোগ দিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে গেলে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
ধ্রুবকে আটকের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানায় সিজেপি। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা তরুণদের দেখে কর্তৃপক্ষ আতঙ্কিত। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কে এই ধ্রুব রাঠী?
ধ্রুব রাঠী একজন জনপ্রিয় ইউটিউবার, ভিডিও নির্মাতা ও অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা। তাঁর ভিডিওর প্রধান বিষয় ভারতীয় রাজনীতি, ইতিহাস, অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক সমস্যা। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ প্রায়ই রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার জন্ম দেয়।
১৯৯৪ সালের ৮ অক্টোবর ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন ধ্রুব। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে যান। তিনি জার্মানির কার্লসরুহে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়াশোনা করেন। তাঁর শিক্ষাগত পটভূমিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা রয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি ভিডিও নির্মাণের মাধ্যমে অনলাইন জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি।
ভ্রমণের ভিডিও থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
২০১৩ সালে ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে ইউটিউবে যাত্রা শুরু করেন ধ্রুব রাঠী। পরবর্তী সময়ে রাজনীতি ও সামাজিক বিষয় নিয়ে ভিডিও তৈরিতে বেশি মনোযোগী হন। জটিল বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা, বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক বক্তব্যের সমালোচনা তাঁর ভিডিওর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
রাজনৈতিক ভিডিওর পাশাপাশি ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টের জন্যও পরিচিত তিনি। ‘পি নিউজ’ নামে একটি বিভাগে ব্যঙ্গের মাধ্যমে বিভিন্ন ঘটনা ও সংবাদ উপস্থাপন করেন। এসব ভিডিওর মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা বিষয়কে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি।
২০২০ সালের জুলাইয়ে ‘ধ্রুব রাঠী ভ্লগস’ নামে আরেকটি ইউটিউব চ্যানেল চালু করেন। সেখানে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভিডিও প্রকাশ করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর কাজের মধ্যে ভ্রমণবিষয়ক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জন্য তৈরি কনটেন্ট রয়েছে। পাশাপাশি পডকাস্ট ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমেও কাজ করেছেন তিনি।
২০২৪ সালের এপ্রিলে ধ্রুব রাঠী পাঁচটি নতুন ইউটিউব চ্যানেল চালুর পরিকল্পনার কথা জানান। তামিল, তেলেগু, বাংলা, মারাঠি ও কন্নড় ভাষায় তাঁর ভিডিও প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যাতে ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী দর্শকের কাছে তাঁর কনটেন্ট পৌঁছানো যায়।
নির্বাচনের আগে যে ভিডিও আলোচনায় আসে
২০২৪ সালের ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে ধ্রুব রাঠীর একটি ভিডিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ‘ভারত কি একনায়কতন্ত্রে পরিণত হচ্ছে?’—এমন প্রশ্নকে কেন্দ্র করে তৈরি ভিডিওটিতে চণ্ডীগড়ের মেয়র নির্বাচন, কৃষক আন্দোলন এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করা হয়।
ভিডিওটিতে তিনি ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক পরিবেশ ও সরকারের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। নির্বাচনের আগে ভিডিওটি বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। তাঁর সমর্থকেরা ভিডিওটির তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের প্রশংসা করেন। অন্যদিকে, সরকারের সমর্থকদের একাংশ তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করেন।
ধ্রুবের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হিসেবে তাঁর সহজ উপস্থাপনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং জটিল রাজনৈতিক বিষয় সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করে তোলার দক্ষতাকে উল্লেখ করা হয়। তাঁর ভিডিওতে বিভিন্ন তথ্য, নথি ও ঘটনার ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়। তবে তাঁর বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্কও রয়েছে।
সরকারের সমালোচনা নিয়ে বিতর্ক
ধ্রুব রাঠী নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনুসারী হিসেবে উপস্থাপন করেন না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি যুক্তি, স্বাধীনতা, অগ্রগতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের পক্ষে কথা বলতে চান। তবে তাঁর ভিডিওর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে মতভেদ রয়েছে।
২০১৮ সালে বিজেপির তথ্যপ্রযুক্তি সেল নিয়ে তাঁর একটি ভিডিও প্রকাশের পর তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এ ছাড়া সরকারের সমালোচনামূলক বক্তব্যের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে বিভিন্ন সময় আক্রমণ ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁর সমালোচকেরা তাঁকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করেন, আর সমর্থকেরা তাঁকে সরকারের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠ হিসেবে দেখেন।
২০২৫ সালে পহেলগাঁও হামলার পর ভারতের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তাঁর সমালোচনামূলক ভিডিও নিয়েও আলোচনা হয়। ওই সময় পাকিস্তানের কিছু সংবাদমাধ্যমেও তাঁর ভিডিও প্রচার করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এসব ঘটনা তাঁকে ভারতীয় রাজনীতির আলোচিত অনলাইন ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে আরও সামনে নিয়ে আসে।
ব্যক্তিজীবন ও জনপ্রিয়তা
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবন নিয়েও আলোচনায় থাকেন ধ্রুব রাঠী। ২০২১ সালের নভেম্বরে দীর্ঘদিনের সঙ্গী জুলি এলবিআরকে বিয়ে করেন তিনি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁদের প্রথম সন্তান জন্ম নেয়।
ইউটিউব ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিপুলসংখ্যক অনুসারী রয়েছে। তাঁর ভিডিও নিয়মিত দর্শকদের কাছে পৌঁছায় এবং ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে অনলাইন আলোচনায় প্রভাব ফেলে।
সব মিলিয়ে, ধ্রুব রাঠী এখন ভারতের অন্যতম পরিচিত রাজনৈতিক কনটেন্ট নির্মাতা। সরকারের সমালোচনা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং সহজ ভাষায় জটিল বিষয় তুলে ধরার কারণে তিনি একদিকে যেমন বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক বিতর্কেরও কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। দিল্লিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ঘিরে তাঁকে আটকের ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনাকে আবারও সামনে এনেছে।










