ভারতে বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে কটাক্ষের জবাবে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দিয়ে আলোচনায় আসা অভিজিৎ দীপকে এবার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি। শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লিতে পৌঁছানোর পর তাঁকে এবং তাঁর সংগঠনের আরও দুই নেতাকে আটক করে পুলিশ।

৩১ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পরে বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির দাবিতে সংগঠনটি তরুণদের প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।

শনিবার নয়াদিল্লিতে পৌঁছানোর পর দীপকের সঙ্গে সংগঠনটির আরও দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও আটক করা হয়। বিমানবন্দরে পুলিশের সঙ্গে কথোপকথনের একটি ভিডিওতে দীপককে বলতে শোনা যায়, তিনি গ্রেপ্তার হতে প্রস্তুত এবং পুলিশকে ভয় পান না। তবে পুলিশ সদস্যরা জানান, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, বরং তাঁর সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।

citytouch 728-X-90

ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে দেশজুড়ে পরিচিতি

চলতি বছরের মে মাসে বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে দেওয়া একটি মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ওই মন্তব্যের জবাবে দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দেন। সেখানে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সব তেলাপোকা একসঙ্গে হলে কী ঘটবে।

পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি অনলাইন আন্দোলনের জন্ম হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনটি বিপুলসংখ্যক অনুসারী অর্জন করে। পরে বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনলাইন প্রচারের পাশাপাশি রাজপথেও প্রতিবাদ শুরু করে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে ভারতে ফেরেন দীপকে। তাঁর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা তাঁকে জনস্বার্থে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে আন্দোলনের কারণে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা হুমকির মুখেও পড়েছেন বলে জানিয়েছেন।

শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে আন্দোলন

চলতি বছর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এনে প্রতিবাদে অংশ নেয় দীপকের সংগঠন। এ আন্দোলনে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

দীর্ঘদিনের সমালোচনা ও চাপের মধ্যে গত ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মোদি সরকারের মন্ত্রিসভায় এ ঘটনাকে বিরল হিসেবে দেখা হয়।

এরপর থেকে দীপকে ও তাঁর সমর্থকেরা সরকারি স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়ন, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রচার চালিয়ে আসছেন। সংগঠনটি নিজেদের প্রচলিত রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করা একটি চাপ সৃষ্টিকারী আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরে।

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নতুন বিতর্ক

সম্প্রতি ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে সিজেপি। বিরোধীদের অভিযোগ, খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন দীপকে ও তাঁর সমর্থকেরা।

তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, তালিকা যাচাই ও সংশোধনের সময় বিভিন্ন ধরনের এন্ট্রি চিহ্নিত হওয়ায় এ সংখ্যা তৈরি হয়েছে। ভুলভাবে কারও নাম বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট ভোটাররা পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন বলেও জানিয়েছে কমিশন।

নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে কমিশনের দুই কর্মকর্তার উদ্বেগ প্রকাশের খবর সামনে আসার পর বিতর্ক আরও জোরালো হয়। তবে কমিশনের দাবি, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করার অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছে।

দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তা, আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা

শনিবারের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এ সময় বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারীকে আটক করার খবরও পাওয়া যায়।

এ পরিস্থিতিতে সমর্থকদের শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দীপকে। তিনি মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের আদর্শ অনুসরণের কথাও বলেছেন।

বিমানে ওঠার আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দীপকে বলেন, সামনে কী ঘটবে, তা তিনি জানেন না। তবে ভয় পেয়ে পিছু হটবেন না এবং গণতন্ত্র রক্ষায় আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে দীপকের আন্দোলন ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তরুণদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা এবং রাজপথে সংগঠনটির সক্রিয়তা মোদি সরকারের জন্য কতটা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে, তা এখন দেখার বিষয়।