ভারতের শেয়ারবাজারে চলতি বছর বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। ব্যাপক বিক্রির চাপে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে (বিএসই) তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি রুপি কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর এবারই কি সবচেয়ে খারাপ বার্ষিক পারফরম্যান্সের মুখে পড়তে যাচ্ছে ভারতের শেয়ারবাজার?
চলতি বছর ভারতের প্রধান শেয়ারসূচক নিফটি ৫০ প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে। বাজারের তথ্য অনুযায়ী, এই ধারা অব্যাহত থাকলে অন্তত ১৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতনের মুখে পড়তে পারে সূচকটি। ইন্দোনেশিয়াকে বাদ দিলে বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোর মধ্যে চলতি বছর ভারতের বাজারের অবস্থান সবচেয়ে খারাপ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল ভারত। কিন্তু চলতি বছরের দরপতন সেই চিত্র পাল্টে দিয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতের বাজার থেকে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার বা ৩ লাখ কোটি রুপির বেশি তুলে নিয়েছেন। বিদেশি অর্থের ধারাবাহিক বহির্গমনে শেয়ারদরের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
নিফটি ৫০ সূচকের অন্তর্ভুক্ত ৫০টি কোম্পানির মধ্যে ৩৮টির শেয়ারদর চলতি বছরে কমেছে। এর মধ্যে ২৫টি কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে ১০ শতাংশ বা তার বেশি।
সূচকের বড় পতনের শিকার হয়েছে আইটিসি। চলতি বছর কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ৩৬ শতাংশ। মারুতি সুজুকির শেয়ারদর কমেছে ৩৪ শতাংশ। জিও ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ও এইচডিএফসি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের দরপতন হয়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ করে। অন্যদিকে, এইচডিএফসি ব্যাংকের শেয়ারদর কমেছে ৩০ শতাংশ।
নিফটির আরও কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারদর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এতে বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও বিক্রির চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বড় কোম্পানির পাশাপাশি মাঝারি ও ছোট মূলধনি কোম্পানির শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য দরপতন হয়েছে। সম্প্রতি পর্যন্ত মিডক্যাপ শেয়ারগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও সর্বশেষ কয়েক কার্যদিবসে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে।
চলতি বছর নিফটি মিডক্যাপ ১০০ সূচক প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে সর্বশেষ সপ্তাহেই সূচকটির পতন হয়েছে ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।
মিডক্যাপ শেয়ারগুলোর মধ্যে কেপিআইটি টেকনোলজিসের দর কমেছে ৫৪ শতাংশ। আদিত্য বিড়লা ফ্যাশন অ্যান্ড রিটেইলের শেয়ারদর কমেছে ৫০ শতাংশ এবং পিবি ফিনটেকের কমেছে ৪৪ শতাংশ। মুথুট ফাইন্যান্সের দরপতন হয়েছে ৩৮ শতাংশ, আর পিআই ইন্ডাস্ট্রিজের কমেছে ৩৭ শতাংশ।
ছোট মূলধনি কোম্পানির শেয়ারেও একই ধরনের পতন দেখা গেছে। কেকেইসি ইন্টারন্যাশনালের শেয়ারদর কমেছে ৫৬ শতাংশ, ইনক্স উইন্ডের ৫২ শতাংশ এবং জুপিটার ওয়াগনসের ৪৯ শতাংশ। আইআরসিওএন ইন্টারন্যাশনালের দর কমেছে ৪৫ শতাংশ, আর এনবিসিসির কমেছে ৪৪ শতাংশ।
মিডক্যাপ ও স্মলক্যাপ শ্রেণির আরও বেশ কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারদর চলতি বছর ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে। সর্বশেষ সপ্তাহে নিফটি মিডক্যাপ ১০০ ও নিফটি স্মলক্যাপ ১০০ সূচকের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে মাত্র ছয়টির শেয়ার ইতিবাচক অবস্থানে থেকে লেনদেন শেষ করেছে।
কেন ভারতীয় বাজার থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা?
ভারতের শেয়ারবাজারে দরপতনের অন্যতম কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক অর্থ প্রত্যাহার। গত ১ থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা (এফপিআই) ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে নিট ৪৭ হাজার ৯৫৫ কোটি রুপি তুলে নিয়েছেন।
গিওটাস ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিক্রম সুব্বুরাজের মতে, শেয়ার থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর বেশি কর, মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তন এবং কর-দায় নিয়ে অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় বাজেটে নির্দিষ্ট তালিকাভুক্ত শেয়ার থেকে অর্জিত দীর্ঘমেয়াদি মূলধনি মুনাফার করহার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়। একই সঙ্গে নির্ধারিত শর্তে স্বল্পমেয়াদি মূলধনি মুনাফার করহার ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়।
এর ফলে শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা অর্জনের পর বিনিয়োগকারীদের হাতে আগের তুলনায় কম অর্থ থাকছে। উদাহরণ হিসেবে, করযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধনি মুনাফার প্রতি ১০০ রুপিতে এখন কর দেওয়ার পর বিনিয়োগকারীর হাতে থাকে ৮৭ দশমিক ৫০ রুপি। আগে থাকত ৯০ রুপি। তবে এ হিসাবের মধ্যে অতিরিক্ত সারচার্জ ও সেস অন্তর্ভুক্ত নয়।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য রুপির বিনিময় হারও গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগের সময়কালে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপির দর কমে গেলে ডলারে হিসাব করার সময় তাঁদের প্রকৃত মুনাফা কমে যায়।
তবে শুধু কর বৃদ্ধি দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিপুল অর্থ প্রত্যাহারের ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, শেয়ারের মূল্যায়ন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রত্যাশাও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
সুব্বুরাজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হেফাজতে থাকা ভারতীয় শেয়ারসম্পদের মূল্য ছিল ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার কোটি রুপি। তাঁরা এসব বিনিয়োগ বাড়াবেন, নাকি আরও কমাবেন, তার ওপরও বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করবে।
কর-দায় নিয়ে অনিশ্চয়তাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
সুব্বুরাজের মতে, একটি তহবিলের ভেতরে বিনিয়োগ এক খাত থেকে অন্য খাতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কর-দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। কোনো কোনো বিনিয়োগকারী অর্থ তুলে নেওয়ার পরও করের দাবির মুখে পড়তে পারেন। তহবিল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নিয়ম এবং কর-দায় নিষ্পত্তির নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা থাকলে এসব উদ্বেগ কমানো সম্ভব।
তিনি মনে করেন, শুধু করহার কমালেই সমস্যার সমাধান হবে না। সরকারের উচিত, কর বাড়ানোর ফলে রাজস্ব কতটা বাড়ছে, তার পাশাপাশি তহবিলগুলোর বাস্তব সমস্যাগুলোও পর্যালোচনা করা।
সব মিলিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহার, বড় ও ছোট কোম্পানির শেয়ারদরে ব্যাপক পতন এবং কর-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ভারতের শেয়ারবাজারে চাপ বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে খারাপ বার্ষিক পারফরম্যান্সের মুখে পড়তে পারে দেশটির শেয়ারবাজার। তবে বছর শেষে বাজারের প্রকৃত অবস্থান নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং অর্থপ্রবাহের পরিবর্তনের ওপর।








