একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়া মানে শুধু একটি পরিবারের উৎকণ্ঠা নয়, এটি সমাজের নিরাপত্তাব্যবস্থারও একটি বড় পরীক্ষা। আর নিখোঁজ হওয়ার পর কোনো শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও গভীর করে তোলে। শিশুরা কেন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারছে না এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
নিখোঁজের পর শিশুদের মরদেহ উদ্ধার, হত্যা, ধর্ষণের পর হত্যা ও নির্যাতনের ধারাবাহিক ঘটনা শুধু পরিসংখ্যান নয় এটি আমাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সময়ে হত্যা, ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক ও পারিবারিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৫৫ শিশু। অন্যদিকে বছরের প্রথম সাত মাসে নিখোঁজ হওয়া ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর মধ্যে এখনো ২ হাজার ৩৮ জনের সন্ধান মেলেনি।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, শিশুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। আসকের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এ ছাড়া শারীরিক নির্যাতনে ৬৮, পারিবারিক পরিসরে ৪৯, ধর্ষণের পর ২৬ এবং ধর্ষণচেষ্টার পর চার শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। গুলি, অপহরণ, গৃহকর্মী হিসেবে নির্যাতন ও উত্ত্যক্তের ঘটনাতেও প্রাণ গেছে শিশুদের। একই সময়ে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাই পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। কুমিল্লায় নিখোঁজের পর ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। পাবনায় নিখোঁজের সাত দিন পর ১০ বছরের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়; পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া সাত বছরের এক শিশুর মরদেহ দুই দিন পর সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ এ ঘটনায় ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, শিশুরা শুধু অপরাধীর হাতে নয়, কখনো কখনো পারিবারিক সহিংসতারও শিকার হচ্ছে। লক্ষ্মীপুর, রংপুর, মাদারীপুর ও সুনামগঞ্জে পৃথক ঘটনায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সাত শিশুও নিহত হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নিখোঁজ ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। অর্থাৎ এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ এবং অসীম অনিশ্চয়তা।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একজন শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে খুঁজে বের করতে আমাদের ব্যবস্থা কতটা দ্রুত ও কার্যকর? একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোগ গ্রহণে গড়িমসি নয়, দ্রুত অনুসন্ধান, প্রযুক্তির ব্যবহার, সিসিটিভি ও তথ্য সমন্বয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
শুধু অপরাধ সংঘটনের পর গ্রেপ্তার বা বিচার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। শিশুদের নিরাপত্তার জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সমাজ সব পক্ষকে দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর বিচার এবং শিশুবান্ধব সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ইউনিসেফও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত বিচার, জবাবদিহি এবং শিশুবান্ধব সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজেরও মৌলিক দায়িত্ব।
দুই হাজারের বেশি শিশু এখনো নিখোঁজ এই সংখ্যাকে কেবল একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে বের করা এবং প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি দায়িত্ব।
মামুনুর রশিদ খাঁন: সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত), দুরবীন নিউজ নিউজ।










