গত ছয় বছরে দেশে অপহরণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মোট ৩ হাজার ৯১২টি অপহরণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ সালে। ওই বছরই ১ হাজার ১০২ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন।
২০২৪ সালে যেখানে অপহরণের ঘটনা ছিল ৬৪২টি, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১০২টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অপহরণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৭১ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
চলতি বছরেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে অপহরণের ঘটনা ৮০০ ছাড়িয়েছে। ফলে বছর শেষে মোট সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে অপহরণ
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১ সালে দেশে ৪৪৫টি অপহরণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৬০টি এবং ২০২৩ সালে ৪৬৩টি। ২০২৪ সালে অপহরণের ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪২টিতে।
এরপর ২০২৫ সালে হঠাৎ করেই বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়। ওই বছর ১ হাজার ১০২টি অপহরণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়।
অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অপহরণের ঘটনা বেড়েছে ৬৫৭টি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই বৃদ্ধি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসেও অপহরণের ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য। জানুয়ারিতে ১০৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৭৮, মার্চে ৮৩, এপ্রিলে ৮৮, মে মাসে ৮২, জুনে ৮০, আগস্টে ৯০, সেপ্টেম্বরে ৯৬ এবং অক্টোবরে ১১০ জন অপহরণের শিকার হন। এসব হিসাব অনুযায়ী, বছরের প্রথম ১০ মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিনজন অপহরণের শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম ১০ মাসে অপহরণের ঘটনা ছিল ৫০১টি। পরের বছর একই সময়ে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
চলতি বছরেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সারা দেশে অপহরণের ঘটনায় ৬৯১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই ১২৯টি মামলা হয়েছে।
অর্থাৎ বছরের প্রথম আট মাসে সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিনটি করে অপহরণের মামলা হয়েছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপহরণের ঘটনা ৮০০ ছাড়িয়ে যাওয়ায় বছর শেষে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে।
কেন বাড়ছে অপহরণ?
অপহরণের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। মুক্তিপণ আদায় অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলেও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নানা ধরনের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অপরাধমূলক কারণ।
তদন্তে বিভিন্ন ঘটনায় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, প্রেমঘটিত বিরোধ, প্রতিশোধ, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধ এবং ডিজিটাল যোগাযোগের অপব্যবহারের মতো বিষয় সামনে এসেছে।
অনেক ক্ষেত্রে অপহরণের পর পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়। আবার কিছু ঘটনায় অপহরণের পর নির্যাতন কিংবা হত্যার ঘটনাও ঘটছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপহরণের প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা জরুরি। অপহরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা চক্রের পাশাপাশি নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
অপহরণের পর হত্যার ঘটনাও বাড়ছে
অপহরণের পর হত্যার ঘটনাও সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় অপহরণের কয়েক ঘণ্টা পর ইসফাতুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা আলোচনায় আসে।
প্রাথমিক তদন্তে তার অপহরণ ও হত্যার পেছনে আর্থিক কারণের বিষয়টি সামনে আসে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এ ধরনের ঘটনায় অপহরণের উদ্দেশ্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। কোথাও মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা হচ্ছে, আবার কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, প্রেমঘটিত বিরোধ কিংবা প্রতিশোধের কারণে অপহরণের পর হত্যার ঘটনা ঘটছে।
মুক্তিপণের জন্য অপহরণের অভিযোগ
সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর তার পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগ ওঠে। একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে তাকে তুলে নেওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের কাছে ফোন করে বিপুল অর্থ দাবি করা হয়।
গাইবান্ধাতেও এক ব্যক্তিকে অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ পাওয়া যায়। রাজধানীর পুরান ঢাকার কদমতলী এলাকাতেও একজনকে অপহরণের অভিযোগে মামলা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। পরে মুক্তিপণের বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা
পুলিশের নথিভুক্ত মামলার বাইরেও অনেক অপহরণের ঘটনা থেকে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক, স্থানীয় বা সামাজিক প্রভাবের কারণে অনেক পরিবার মামলা করতে না পারায় প্রকৃত অপহরণের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলেও সব ঘটনায় অপহরণ মামলা হয় না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে অপহরণের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।
প্রতিরোধে প্রয়োজন দ্রুত তদন্ত
অপহরণ প্রতিরোধে শুধু মামলা ও গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। অপহরণকারী চক্র শনাক্ত করার পাশাপাশি তাদের অর্থের উৎস, মুক্তিপণ লেনদেন এবং ডিজিটাল যোগাযোগের ওপর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে দ্রুত সমন্বিত অভিযান চালানো এবং শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিটি অপহরণের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধও বাড়বে।
২০২১ সালের ৪৪৫টি থেকে ২০২৫ সালে ১ হাজার ১০২টি—অপহরণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নিঃসন্দেহে বড় সতর্কবার্তা। চলতি বছরেও সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে যাওয়ায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।









