রংপুরের পীরগাছায় নতুন সার ডিলার নিয়োগকে ঘিরে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগের মধ্যেই উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্বাক্ষর করা একটি দলীয় প্যাডের তালিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ‘ডিলার নিয়োগ-২০২৬ এর তথ্য’ শিরোনামের ওই তালিকায় ৯টি ইউনিয়নের ১৯ জনের নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন এবং আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নামও রয়েছে বলে নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত তালিকাটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তালিকায় তাম্বুলপুর ও পীরগাছা সদর ইউনিয়নে তিনজন করে এবং বাকি সাত ইউনিয়নে দুইজন করে মোট ১৯ জনের নাম রয়েছে।

তালিকাটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী, ইউনিয়ন বিএনপির নেতাদের সন্তান, শ্বশুর ও অন্যান্য আত্মীয়ের নাম রয়েছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নামও রয়েছে।

citytouch 728-X-90

তাম্বুলপুর ইউনিয়নের তালিকায় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী সুইটি বেগমের নাম রয়েছে। একই তালিকায় আওয়ামী লীগের সাবেক ওয়ার্ড সভাপতির ছেলে আব্দুল জলিল এবং জামায়াতের কর্মী হিসেবে পরিচিত জাহেদুল ইসলামের নাম রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

পীরগাছা সদর ইউনিয়নের তালিকায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী সুলতানা ফেরদৌসির নাম রয়েছে। একই ইউনিয়নের তালিকায় জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আমির হোসেনের নামও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অন্যান্য ইউনিয়নের তালিকাতেও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও তাদের স্বজনদের নাম রয়েছে। কল্যাণী ইউনিয়নে সাবেক ও বর্তমান বিএনপি নেতার নাম, কান্দিতে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের নাম, পারুলে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম, কৈকুড়িতে সিনিয়র সহসভাপতির ছেলের নাম এবং ছাওলায় বিএনপির সহ-কোষাধ্যক্ষ ও কৃষক দলের সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তির নাম দেওয়া হয়েছে।

ইটাকুমারী ইউনিয়নের তালিকায় বিএনপি সমর্থক হিসেবে পরিচিত দুজনের নাম রয়েছে। তাদের একজনের জামাতা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং অপরজন জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতির ঘনিষ্ঠ বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। অন্নদানগর ইউনিয়নের তালিকায় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির প্রথম স্ত্রীর মেয়ের নাম এবং ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের ফুফাতো ভাইয়ের নাম রয়েছে।

এদিকে, সার ডিলার নিয়োগে প্রতি ইউনিয়নে ১৫ লাখ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এসব অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। এ নিয়ে অভিযোগ তোলার পর কান্দি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক জিয়াউর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির অভিযোগে তাকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর সার ডিলার নিয়োগে টাকা নেওয়ার অভিযোগকে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেস।

তবে দলীয় প্যাডে প্রকাশিত তালিকা নিয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা বলেন, সার ডিলার নিয়োগের জন্য তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় বা কৃষি অফিসে কোনো তালিকা দেননি। প্রতিবেদকের কাছে তালিকা থাকার কথা জানানো হলে তিনি সেটি না দেখে মন্তব্য করতে পারবেন না বলে জানান।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াছমিন বলেন, উপজেলা বিএনপির সভাপতির দেওয়া কোনো তালিকা তিনি পাননি। কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নাম পাঠানো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জায়েদ ইমরুল মুজাক্কিনও জানান, উপজেলা বিএনপির সভাপতির পক্ষ থেকে তাকে কোনো তালিকা দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষ্য, স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়নে তিনজনের তালিকা তৈরি করে জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই তার জবাব দিতে হবে।

ফলে দলীয় প্যাডে তৈরি ১৯ জনের তালিকাটি কার মাধ্যমে তৈরি ও কোথায় জমা দেওয়া হয়েছিল এবং সার ডিলার নিয়োগের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।