জীবিকার তাগিদে অনেক স্বামী স্ত্রী ও সন্তানদের দেশে রেখে প্রবাসে থাকেন। কেউ কয়েক মাস পর দেশে ফেরেন, আবার কেউ বছরের পর বছর পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকেন। এ অবস্থায় স্ত্রীর ভরণপোষণ, দাম্পত্য অধিকার ও মানসিক চাহিদা পূরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রবাসে থাকলেই কি স্ত্রীর অধিকার ক্ষুণ্ন হয়? এ বিষয়ে ইসলাম কী বলে?

ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, কাজের প্রয়োজনে স্বামীর বিদেশে থাকা নিজে থেকেই অন্যায় নয়। তবে প্রবাসে থাকার কারণে স্ত্রীর ন্যায্য অধিকার অবহেলিত হলে তা দায়িত্বে অবহেলা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। স্ত্রীর আর্থিক প্রয়োজন পূরণ, তাঁর সঙ্গে সদাচরণ এবং দাম্পত্য জীবনের অধিকার রক্ষা করা স্বামীর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

হানাফি ফিকহভিত্তিক বিভিন্ন ফতোয়ায় দীর্ঘদিন আলাদা থাকার ক্ষেত্রে স্ত্রীর সম্মতি ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দারুল উলুম দেওবন্দের একটি ফতোয়ায় বলা হয়েছে, স্ত্রী সম্মতি দিলে স্বামী চার মাসের বেশি সময় দূরে থাকতে পারেন। তবে স্ত্রী সম্মতি না দিলে এবং তাঁর দাম্পত্য অধিকার অপূর্ণ থাকলে স্বামীর উচিত ফিরে এসে তাঁর প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করা।

citytouch 728-X-90

তবে চার মাসকে সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য নির্দিষ্ট সময়সীমা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতি, স্ত্রীর প্রয়োজন, দূরে থাকার কারণ এবং দাম্পত্য অধিকার কতটা পূরণ হচ্ছে—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।

বছরের পর বছর দূরে থাকলে কী হবে?

দীর্ঘদিন স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে দূরে থাকলে তাঁদের প্রতি স্বামীর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পরিবারের অধিকার উপেক্ষা করে দীর্ঘ সময় আলাদা থাকলে দাম্পত্য জীবনে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই স্বামীর উচিত স্ত্রীর প্রয়োজন ও অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

অবশ্য ভিসা জটিলতা, চাকরির বাধ্যবাধকতা কিংবা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকতে বাধ্য হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে স্বামী পরিবারের ভরণপোষণ নিশ্চিত করছেন কি না, নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন কি না, স্ত্রীর প্রয়োজন ও অনুভূতির প্রতি যত্নশীল কি না এবং একসঙ্গে থাকার বাস্তবসম্মত চেষ্টা করছেন কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

স্ত্রীর কোন অধিকারগুলো রক্ষা করতে হবে?

প্রবাসে থাকলেও স্বামীর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে স্ত্রীর ন্যায্য ভরণপোষণ নিশ্চিত করা, তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, প্রয়োজন ও সমস্যার খোঁজ নেওয়া এবং দাম্পত্য সম্পর্কের অধিকার যথাসম্ভব পূরণ করা। শুধু টাকা পাঠানোই সব দায়িত্বের পূর্ণতা নয়; স্ত্রীর মানসিক চাহিদা ও পারিবারিক দায়িত্বের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

স্ত্রীর সম্মতি ও পরিস্থিতি বিবেচনা না করে দীর্ঘদিন আলাদা থাকার ফলে তাঁর অধিকার ক্ষুণ্ন হলে স্বামীর উচিত বিষয়টি সমাধানে উদ্যোগী হওয়া। প্রয়োজনে স্বামী-স্ত্রী আলোচনা করে দেশে ফেরা, স্ত্রীকে প্রবাসে নিয়ে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।

এ বিষয়ে ইসলামী চিন্তাবিদ শায়খ আহমাদুল্লাহর পরামর্শ হলো, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আলোচনা করে স্ত্রীর মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হবে এবং দীর্ঘ সময় আলাদা থাকার বিষয়টি এড়িয়ে চলতে হবে।

সব মিলিয়ে, জীবিকার প্রয়োজনে প্রবাসে থাকা অন্যায় নয়। তবে এর কারণে স্ত্রীর ন্যায্য অধিকার ও দাম্পত্য দায়িত্ব অবহেলা করা উচিত নয়। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতি, দায়িত্বশীলতা এবং পরিবারের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শরিয়তের বিধান জানতে নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।