বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে নতুন করে পাঁচটি ডিজিটাল ব্যাংকের প্রাথমিক অনুমোদন নিঃসন্দেহে আর্থিক সেবার প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। শাখা বা উপশাখা ছাড়াই স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার ধারণা আধুনিক। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর একটি ব্যবস্থা চালু করলেই সেটি কার্যকর, নিরাপদ ও টেকসই হয়ে যায় না। বরং এখানেই শুরু হয় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের।

দেশে ইতোমধ্যে ব্যাংকিং সেবার পাশাপাশি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, অ্যাপভিত্তিক লেনদেন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল আর্থিক সেবা চালু রয়েছে। ফলে নতুন পাঁচটি ডিজিটাল ব্যাংক বাস্তবে কোন নতুন সেবা দেবে, কারা তাদের প্রধান গ্রাহক হবে এবং প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার কোন ঘাটতি পূরণ করবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পরিষ্কার হওয়া জরুরি।

ডিজিটাল ব্যাংকের ধারণার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ব্যাংকের শাখায় না গিয়েও গ্রাহক আর্থিক সেবা নিতে পারবেন। হিসাব খোলা, টাকা স্থানান্তর, সঞ্চয়, ঋণ আবেদন কিংবা বিভিন্ন ব্যাংকিং কার্যক্রম ঘরে বসেই করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তরুণ প্রজন্ম এবং ছোট ব্যবসার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

citytouch 728-X-90

তবে এই সম্ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্বও কম নয়। বাংলাদেশের সব মানুষ এখনো সমানভাবে স্মার্টফোন, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট কিংবা ডিজিটাল সেবার সঙ্গে যুক্ত নন। শুধু প্রযুক্তি থাকা মানেই প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা থাকা নয়। ডিজিটাল সাক্ষরতা ও আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি থাকলে নতুন সেবা তৈরি হলেও এর সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ, বয়স্ক নাগরিক এবং প্রযুক্তিতে অনভ্যস্ত গ্রাহকদের কথা বিবেচনায় নিতে হবে। একজন গ্রাহক যদি অ্যাপ ব্যবহার করতে না পারেন, প্রতারণার শিকার হলে অভিযোগ করার প্রক্রিয়া না বোঝেন কিংবা নিজের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারেন, তাহলে শাখাবিহীন ব্যাংকিং তার জন্য সুবিধার বদলে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আর এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সাইবার নিরাপত্তা। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জালিয়াতি, অননুমোদিত লেনদেন কিংবা প্রতারণার ঝুঁকি থাকলেও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে এর ধরন আরও জটিল হতে পারে। ফিশিং, ভুয়া অ্যাপ, পরিচয় চুরি, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি হাতিয়ে নেওয়া, সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক প্রতারণা এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় শক্তিশালী প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন।

শুধু ব্যাংকের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেই হবে না। গ্রাহকের অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামোও প্রয়োজন। কোনো ডিজিটাল ব্যাংকের সিস্টেমে বড় ধরনের ত্রুটি বা সাইবার হামলা হলে গ্রাহক কীভাবে ক্ষতিপূরণ পাবেন, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি হবে কীভাবে, তথ্য ফাঁস হলে দায় নেবে কে এসব প্রশ্নের উত্তর আগেই স্পষ্ট থাকা দরকার।

আরেকটি বিষয় হলো ব্যাংক খাতের সামগ্রিক সক্ষমতা ও আস্থা। দেশে ব্যাংকের সংখ্যা নিয়ে যখন দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে, তখন নতুন ব্যাংক অনুমোদনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একটি ব্যাংক খোলা মানে শুধু লাইসেন্স দেওয়া নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মূলধন, ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা, আমানত সুরক্ষা, প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি।

ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। বরং শাখাবিহীন হওয়ায় প্রযুক্তি ও সাইবার অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা আরও বেশি। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দুর্বল হলে তার প্রভাব দ্রুত বড় সংখ্যক গ্রাহকের ওপর পড়তে পারে।

এখানে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে ডিজিটাল ব্যাংকগুলো কীভাবে মুনাফা করবে? নতুন গ্রাহক আকর্ষণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, ডেটা সেন্টার, সফটওয়্যার, গ্রাহকসেবা এবং নিয়মিত প্রযুক্তি আপডেট সবকিছুতেই বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। অন্যদিকে গ্রাহকদের কাছ থেকে কতটা আমানত সংগ্রহ করা যাবে এবং সেই আমানত থেকে কীভাবে নিরাপদ ও লাভজনক ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু সব ডিজিটাল ব্যাংক সমানভাবে সফল হয়নি। কোথাও গ্রাহকসংখ্যা বেড়েছে, আবার কোথাও দীর্ঘদিন ধরে লোকসান বা বিনিয়োগনির্ভর কার্যক্রম চালাতে হয়েছে। তাই বিদেশে একটি মডেল সফল হয়েছে বলেই বাংলাদেশের বাজারেও সেটি একইভাবে সফল হবে এমন নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশের বাজারের বাস্তবতা আলাদা। এখানে একদিকে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী ও দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল ব্যবহারকারী রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে আর্থিক ও ডিজিটাল বৈষম্য। ফলে ডিজিটাল ব্যাংকের ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করতে হলে শুধু তরুণ ও প্রযুক্তিবান্ধব গ্রাহকদের দিকে তাকালে চলবে না। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আয়, সঞ্চয়, ঋণপ্রয়োজন, ব্যবসার ধরন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূলধনের এই বাধ্যবাধকতা নিঃসন্দেহে একটি আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু বড় মূলধন থাকলেই ভালো ব্যাংকিং নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রাহকের প্রতি জবাবদিহি।

এখানেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ব্যাংকগুলো কীভাবে গ্রাহক সংগ্রহ করছে, কীভাবে ঋণ দিচ্ছে, কীভাবে ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বজায় রাখছে এসব বিষয়ে নিয়মিত ও কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে। শুধু কোনো অনিয়ম ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, বরং অনিয়মের ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করার মতো তদারকি কাঠামো প্রয়োজন।

বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে গ্রাহকের তথ্য কে ব্যবহার করতে পারবে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের নিয়ম কী এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা জরুরি। গ্রাহক যেন শুধু একটি অ্যাপের ‘টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন’ মেনে না বুঝেই নিজের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে না ফেলেন, সে জন্য সহজ ভাষায় তথ্য জানানোর ব্যবস্থাও থাকা উচিত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিযোগিতা। নতুন ডিজিটাল ব্যাংক বাজারে এলে সেবার মান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। গ্রাহক কম খরচে দ্রুত সেবা পেতে পারেন। কিন্তু প্রতিযোগিতা যেন শুধু বেশি গ্রাহক সংগ্রহ বা বেশি অ্যাকাউন্ট খোলার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রকৃত প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সহজ ও নির্ভরযোগ্য সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্যাংকিং খাত কোনো পরীক্ষাগার নয় যেখানে ব্যর্থতার মূল্য শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের। ব্যাংকের সঙ্গে মানুষের সঞ্চয়, ব্যবসা, বেতন, পেনশন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জড়িত। একটি ডিজিটাল ব্যাংকের বড় ধরনের ব্যর্থতা হলে এর প্রভাব শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; পুরো ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

তাই পাঁচটি নতুন ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদনকে শুধু ‘আরও পাঁচটি ব্যাংক’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটিকে দেখতে হবে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি পরীক্ষা হিসেবে। এই পরীক্ষা সফল করতে হলে প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, সাইবার নিরাপত্তা, গ্রাহক সুরক্ষা এবং স্বচ্ছ ব্যবসায়িক মডেল নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের প্রশ্ন নতুন ডিজিটাল ব্যাংক থাকবে কি থাকবে না এতটা সরল নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, যে ডিজিটাল ব্যাংকগুলো আসছে, তারা কী ধরনের ব্যাংকিং সংস্কৃতি তৈরি করবে? তারা কি গ্রাহকের অর্থ ও তথ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে? তারা কি ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা বজায় রাখবে? তারা কি প্রযুক্তির সুবিধা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং সহজ করবে? নাকি শেষ পর্যন্ত নতুন নাম ও নতুন অ্যাপ নিয়ে প্রচলিত সমস্যাগুলোরই আরেকটি সংস্করণ তৈরি হবে?

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ আছে। বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার বিস্তার এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের দ্রুত প্রসার ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের জন্য বড় বাজার তৈরি করতে পারে। কিন্তু সুযোগকে সাফল্যে পরিণত করতে হলে আস্থা অর্জন করতে হবে।

সবশেষে তাই আমাদের অবস্থান স্পষ্ট ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ানোই সাফল্যের মাপকাঠি নয়। গ্রাহকের অর্থ নিরাপদ রাখা, সেবা সহজ করা, প্রতারণা ঠেকানো, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকা সফল ডিজিটাল ব্যাংকের আসল পরীক্ষা সেখানেই।

নতুন পাঁচটি ডিজিটাল ব্যাংক সেই পরীক্ষায় কীভাবে নিজেদের প্রমাণ করে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।