যে হাত একদিন ইট-বালু-কংক্রিটের ভার সামলে অন্যের স্বপ্নের ঘর তুলেছিল, এক দুর্ঘটনার পর সেই হাতেই ভর করে নতুন করে জীবন শুরু করতে হয়েছে সালাউদ্দিনকে। বহুতল ভবন থেকে পড়ে মেরুদণ্ডের পাঁচটি হাড় ভেঙে যাওয়ার পর কোমরের নিচের অংশের অনুভূতি হারিয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, আগের মতো আর রাজমিস্ত্রির কাজ করা সম্ভব হবে না। সংসারের আয়ের পথও তখন প্রায় বন্ধ।
কিন্তু শরীর থেমে গেলেও থেমে থাকেনি তাঁর ইচ্ছাশক্তি।
ভোলার সদর উপজেলার ভেলুমিয়া ইউনিয়নের ৩২ বছর বয়সী সালাউদ্দিন এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান। প্রতিদিন রাস্তায় বের হন যাত্রী নিয়ে। সেই আয় দিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পরিবারের খরচেও বড় অংশ দেন। শুধু নিজের জীবনটাকেই তিনি নতুন করে গুছিয়ে নেননি, নিজের মতো প্রতিবন্ধী অন্য মানুষদের সরকারি সেবা ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পথ দেখাতেও এখন ভূমিকা রাখছেন।
সালাউদ্দিনের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের পেছনে আছে দীর্ঘ অভাব, পারিবারিক সংকট, একের পর এক আঘাত এবং শেষ পর্যন্ত সহায়তা পেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এক কঠিন লড়াই।
সালাউদ্দিন আমেনা বিবি ও লোকমান খাঁর সাত সন্তানের একজন। চার ছেলে ও তিন মেয়ের পরিবারটি শুরু থেকেই আর্থিক সংকটে ছিল। প্রায় ১৫ বছর আগে সন্তানদের নিয়ে ভেলুমিয়া ছেড়ে চট্টগ্রামে পাড়ি জমিয়েছিলেন তাঁর মা-বাবা। লোকমান খাঁ সেখানে ঠেলাগাড়ি চালাতেন। আমেনা বিবি কাজ করতেন পোশাক কারখানায়। আয় ছিল সীমিত, কিন্তু সন্তানদের পড়াশোনা করানোর স্বপ্ন ছিল তাঁদের।
লোকমান খাঁ সন্তানদের প্রায়ই বলতেন, পড়াশোনা করে একদিন তারা প্রতিষ্ঠিত হবে। অভাবের দিন শেষ হবে। নিজেদের বাড়িতে ফিরে শান্তিতে বসবাস করবেন তাঁরা।
কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে বেশিদিন এগোতে পারেননি তিনি।
২০১৪ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন লোকমান খাঁ। পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হলে কখনো কাজে যেতে পারতেন, কখনো পারতেন না। আর্থিক সংকট ও চিকিৎসার সীমাবদ্ধতার মধ্যে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ওই বছরের ২৪ আগস্ট মারা যান তিনি।
স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের নিয়ে ভেলুমিয়ায় ফিরে আসেন আমেনা বিবি। স্বামীর মরদেহ বাড়িতে আনতে অ্যাম্বুলেন্সের খরচসহ নানা ব্যয় মেটাতে বসতভিটার ১৬ শতক জমির মধ্যে তিন শতক বিক্রি করতে হয় তাঁকে। এরপর বড় দুই ছেলে অল্প মজুরিতে কাজে যোগ দেন।
সালাউদ্দিন তখন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। সংসারের অভাব তাঁকে আর স্কুলে থাকতে দেয়নি। রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। সময়ের সঙ্গে কাজ শিখে নিজেই রাজমিস্ত্রির কাজে যুক্ত হন। নিজের পড়াশোনা থেমে গেলেও ছোট বোনদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর সহযোগিতায় দুই বোন এইচএসসি পাস করেন। তাঁদের একজনের বিয়ে হয়েছে। আরেকজন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। অন্য এক বোন এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী।
এর মধ্যেই পরিবারে আসে আরেক দুঃসময়। কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ইটের আঘাতে গুরুতর আহত হন সালাউদ্দিনের মেজো ভাই। যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার পর তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। বর্তমানে তিনি মানসিক প্রতিবন্ধিতা নিয়ে জীবনযাপন করছেন।
সবকিছুর পরও সালাউদ্দিন তখন সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের এক দুর্ঘটনা তাঁর নিজের জীবনটাকেই ওলটপালট করে দেয়।
রাজমিস্ত্রির কাজ করার সময় বহুতল ভবন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর মেরুদণ্ডের পাঁচটি হাড় ভেঙে গেছে। এল-৪ ও এল-৫ হাড়ের ক্ষতির কারণে কোমরের নিচের অংশে অনুভূতি হারিয়ে ফেলেন তিনি।
এরপর আর রাজমিস্ত্রির কাজ করা সম্ভব হয়নি।
যে মানুষটি প্রতিদিন নির্মাণস্থলে দাঁড়িয়ে অন্যের ঘর তৈরির স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতেন, হঠাৎ তাকেই নিজের চলাফেরা ও জীবিকার জন্য অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। পরিবারের আয় কমে যায়। নিজের চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের পাশাপাশি সংসারের দায়িত্বও তখন বড় হয়ে দাঁড়ায়।
এই সংকটের সময়ে তাঁদের পাশে আসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পিকেএসএফের অর্থায়ন ও সহযোগিতায় গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস) পরিচালিত পিপিইপিপি-ইউ প্রকল্প। প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে—এমন পরিবার হিসেবে আমেনা বিবির পরিবারটি প্রকল্পের আওতায় অগ্রাধিকার পায়।
প্রথমে পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা মেটাতে বাড়ির পাঁচ শতক জমিতে সবজি চাষের জন্য বীজ দেওয়া হয়। পরে টিকাদান, কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শের মাধ্যমে তাঁদের পরিবারে গড়ে ওঠে হাঁস-মুরগি পালনের ছোট উদ্যোগ। বর্তমানে তাঁদের বাড়িতে রয়েছে ১৭টি দেশি মুরগি ও ১২টি হাঁস।
তবে সালাউদ্দিনের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে চলাচলের জন্য পাওয়া একটি ট্রাইসাইকেল থেকে। সেটি তাঁকে শুধু চলাফেরার স্বাধীনতাই দেয়নি, নতুন করে জীবিকা নিয়ে ভাবার সুযোগও তৈরি করে।
নিজের আগ্রহ ও শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আয়বর্ধক কার্যক্রমের আওতায় তাঁকে সহায়তা দেওয়া হয়। প্রকল্পের সহায়তার সঙ্গে জিজেইউএসের ক্ষুদ্রঋণ যুক্ত করে তাঁর জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করা একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কেনার ব্যবস্থা করা হয়।
সেই অটোরিকশাই হয়ে ওঠে সালাউদ্দিনের নতুন জীবনের চাকা।
অটোরিকশা চালিয়ে তিনি বর্তমানে মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। এই অর্থ দিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পরিবারের খরচেও সহায়তা করেন। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর দৈনন্দিন জীবনে কিছু বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হয়। প্রস্রাব ও মলত্যাগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যার কারণে তাঁকে অ্যাডাল্ট ডায়াপার ব্যবহারের বিষয়েও সহায়তা করা হয়েছে।
সরকারি প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র বা সুবর্ণ কার্ড পেতে এবং প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আসতেও সহযোগিতা পেয়েছেন তিনি। পরে আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে পান ৩০ হাজার টাকা অনুদান। নিজের পুরোনো অটোরিকশা বিক্রির অর্থ ও ওই অনুদান মিলিয়ে নতুন একটি অটোরিকশা কেনেন সালাউদ্দিন।
নতুন গাড়ি পাওয়ার পর তাঁর কাজের পরিধি বেড়েছে। তুলনামূলক বেশি সময় যাত্রী পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বেড়েছে দৈনিক আয়ও। একসময় যে মানুষটির ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা দুশ্চিন্তায় ছিলেন, এখন সেই সালাউদ্দিনই পরিবারের আয়ের অন্যতম অবলম্বন।
সালাউদ্দিনের জীবনে পরিবর্তন শুধু জীবিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও পেয়েছেন সহায়তা। স্যাটেলাইট ক্লিনিকের মাধ্যমে এখন বাড়িতে বসেই চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে তাঁর। তাঁর মানসিক প্রতিবন্ধিতা নিয়ে জীবনযাপনকারী ভাইও প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত মানসিক স্বাস্থ্য ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ পেয়েছেন।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সালাউদ্দিনের নিজের ভূমিকার মধ্যে। একসময় তিনি ছিলেন সহায়তা প্রয়োজন এমন একজন মানুষ। এখন নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অন্যদের সহায়তা করছেন।
প্রকল্পের আওতায় গঠিত প্রতিবন্ধী ফোরামের নিয়মিত সদস্য তিনি। এলাকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরকারি সেবা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা করেন। নিজের সুবর্ণ কার্ড পেতে একসময় তাঁকে যেসব দপ্তরে ঘুরতে হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতাই এখন অন্যদের কাজে লাগাচ্ছেন। কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সরকারি সহায়তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে পাশে দাঁড়াচ্ছেন তিনি।
এভাবেই নিজের জীবনের সংকটকে তিনি অন্যদের জন্য অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছেন।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে আয়োজিত একটি সফলতা অনুষ্ঠানে সালাউদ্দিনকে তাঁর অর্জনের জন্য পুরস্কৃতও করা হয়। সেখানে তাঁর জীবনের পরিবর্তনের গল্প তুলে ধরে অন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়।
ভোলা সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, “সামান্য প্রতিবন্ধিতা নিয়েই অনেকে ভিক্ষাবৃত্তির মতো অসম্মানজনক পেশায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। কিন্তু সালাউদ্দিন সেটা না করে নিজের মনের জোরে আজ সুবর্ণ কার্ডধারী একজন সুবর্ণ নাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি অন্য সবার জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠছেন।”
ছেলের এই পরিবর্তন এখনও আমেনা বিবির কাছে অনেকটা অবিশ্বাস্য। যে সন্তানকে দুর্ঘটনার পর একসময় পরিবারের বোঝা হয়ে যেতে দেখেছিলেন, সেই সন্তানই এখন নিজের আয় দিয়ে সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন।
আমেনা বিবি বলেন, “একদিন যে সালাউদ্দিনকে আল্লাহ উঠিয়ে নাও বলে বদদোয়া করতাম, সেই সালাউদ্দিন আবার নিজে আয় করে পরিবারের হাল ধরতে পারবে, তা আমি নিজেও কখনো কল্পনা করিনি। এই প্রকল্প (পিপিইপিপি-ইউ) ছিল বলেই তা সম্ভব হয়েছে।”
সালাউদ্দিনের গল্প তাই শুধু একটি দুর্ঘটনার পর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নয়। এটি দেখায়, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা একজন মানুষের কর্মক্ষমতা কিংবা স্বপ্নের শেষ সীমা নয়। উপযুক্ত সহায়তা, জীবিকার সুযোগ, প্রশিক্ষণ এবং সহায়ক পরিবেশ পেলে একজন মানুষ নিজের জীবন যেমন বদলাতে পারেন, তেমনি পরিবারের দায়িত্বও নিতে পারেন।
সালাউদ্দীন বলেন “মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল জীবন থেমে গেছে। এখন অটোরিকশা চালিয়ে বুঝেছি, শরীরের সীমাবদ্ধতা থাকলেও ইচ্ছাশক্তি থাকলে আবারও ঘুরে দাঁড়ানো যায়।”
একসময় সালাউদ্দিন অন্যের বাড়ি তুলতেন। একটি দুর্ঘটনা তাঁর নিজের জীবনকেই যেন ভেঙে দিয়েছিল। মেরুদণ্ডের পাঁচটি হাড় ভেঙে যাওয়ার পর কোমরের নিচের অংশে হারিয়েছিলেন অনুভূতি। কিন্তু হারাননি সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা।
এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার স্টিয়ারিং ধরে প্রতিদিন রাস্তায় বের হন তিনি। যাত্রী বহন করেন, আয় করেন, পরিবারের পাশে দাঁড়ান। আর নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্য প্রতিবন্ধী মানুষকে বোঝান—জীবনের কোনো একটি দুর্ঘটনা পুরো জীবনকে থামিয়ে দেওয়ার শেষ কথা নয়।










