প্রতিবেদকঃ বিল ইয়ানুর তালুকদার

বাংলাদেশের ছাত্র ও তরুণ রাজনীতির ইতিহাসে একটি কথা প্রায় প্রবাদে রূপ নিয়েছে, “মার খেতে খেতে সংসদে ভিপি নুর।” ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সাত বছর রাজপথের প্রতিটি রক্তক্ষয়ী বাঁকে মার খেয়েছেন নুরুল হক নুর। হামলা, মামলা, জেল আর রিমান্ডের সেই দুঃসহ পথ মাড়িয়ে শেষমেশ তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে কেবল এমপি-ই হননি, বসেছেন প্রতিমন্ত্রীর চেয়ারেও। 


citytouch 728-X-90

ঠিক এই জায়গাটিতে দাঁড়িয়েই এখন রাজনীতির বড় এক প্রশ্ন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রধান সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী কি তবে নুরের সেই পথেই হাঁটছেন? তিনিও কি মার খেতে খেতেই সংসদে পৌঁছাবেন, নাকি তাঁর নিয়তি শুধুই রাজপথের মার খেয়ে যাওয়া? 


নাসিরের সাম্প্রতিক রাজনীতির দিকে তাকালে নুরের ছায়া স্পষ্ট। যেখানেই তিনি পা রাখছেন, সেখানেই যেন ওত পেতে থাকছে হামলা। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের মাজারে রক্তাক্ত হওয়া ও গাড়ি ভাঙচুর, সিলেটে পদযাত্রায় হামলা, ঝিনাইদহে জুমার নামাজ শেষে পিটুনি কিংবা বেনাপোল সীমান্তে ইটপাটকেল, নাসিরের সফরসূচি যেন মার খাওয়া রাজনীতির এক নজির।


তবে নাসিরের বিরুদ্ধে লড়াইটা কেবল শারীরিক মারধরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, গড়িয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও চরিত্রহননের খেলায়ও। প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁকে ঘায়েল করতে উপাধি দিয়েছে ‘ডার্বি নাসির’। সম্প্রতি নিজেই এই নামের নেপথ্য গল্প খোলাসা করে তিনি জানান, অতীতে ছাত্রদলের এক কর্মীকে ডার্বি সিগারেটে গাঁজা খেতে দেখে নিষেধ করার কারণেই তাঁর ওপর ক্ষোভ তৈরি হয়। তার দাবি, পরবর্তীতে রাজনীতিতে আসার পর সেই ব্যক্তিগত ক্ষোভকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে ছাত্রদলই নাকি পরিকল্পিতভাবে দেশজুড়ে এই ‘ডার্বি নাসির’ তকমা ছড়িয়ে দিয়েছে।


এর সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরও কিছু পুরোনো বিতর্ক। ছাত্র ফেডারেশনের রাজনীতিতে থাকার সময় নাসিরের বিরুদ্ধে ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ এবং সেই অভিযোগে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে ছড়িয়েছে। 


আরেক বিতর্ক ছাগল চুরির অভিযোগ ঘিরে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সরকারি বাসভবন থেকে দুটি পোষা ছাগল চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে নাসিরকে ‘ছাগল চোর’ বলে ট্রল করা হয়। নাসির অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বরং তাঁর বক্তব্য ও ওই ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য থেকেই বিতর্কটি নতুন করে ছড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ‘ছাগল চোর’ বলে আখ্যা দেওয়ার নজিরও দেখা গেছে।


অর্থাৎ, একদিকে রাজপথে হামলা, অন্যদিকে ‘ডার্বি নাসির’ তকমা, পুরোনো ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ আর ছাগল চুরিকে ঘিরে ট্রল, সব মিলিয়ে নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারীর রাজনীতি যেন ক্রমেই হয়ে উঠেছে সংঘাত ও বিতর্কের এক অদ্ভুত মিশেল।


শারীরিক আঘাত আর ‘ডার্বি’ ট্রলের এই জোড়া ধাক্কা সামলে নাসীরুদ্দীন নেমেছিলেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন অগ্নিপরীক্ষায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে তাঁর সরাসরি লড়াই ছিল বিএনপির হেভিওয়েট নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের সঙ্গে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই লড়াইয়ে জয় ধরা দেয়নি নাসীরুদ্দীনের হাতে। মির্জা আব্বাসের কাছে হেরে এমপি হওয়ার স্বপ্নেরও ইতি ঘটে তাঁর।