সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একের পর এক হামলার আশঙ্কা, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করতে হতে পারে রিয়াদকে। এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইলের সঙ্গে গোপন নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও আলোচনায় আসছে।

তবে সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে প্রকাশ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এখনো বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সৌদি আরবের অবস্থান এবং মুসলিম বিশ্বের জনমত এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে নিরাপত্তার প্রয়োজনে সহযোগিতা বাড়লেও তা দ্রুত কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় রূপ নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

নিরাপত্তার চাপে নতুন হিসাব-নিকাশ

citytouch 728-X-90

সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় হুথি গোষ্ঠীর সামরিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। রিয়াদ ও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ঘিরে হামলার হুমকি বাড়লে জ্বালানি অবকাঠামো, বিমানবন্দর এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সৌদি আরবের অর্থনীতি অনেকাংশে জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। তাই তেল পরিবহনব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ঝুঁকির মুখে পড়লে তার প্রভাব শুধু দেশটির নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।

হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি সৌদি আরবের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্প পরিবহনপথ হিসেবে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করার সুযোগ থাকলেও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে রপ্তানি কার্যক্রমে চাপ তৈরি হতে পারে।

ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত ও আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়লে সৌদি আরবের জন্য নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ইসরাইলের সঙ্গে সীমিত নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা তৈরি হতে পারে। ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের সামরিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আকাশ প্রতিরক্ষার মতো বিষয়ে দুই দেশের স্বার্থের কিছু মিল রয়েছে। তবে এ ধরনের সহযোগিতা বাস্তবে কতটা এগোবে, তা নিশ্চিত নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প খুঁজছে সৌদি আরব?

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার। অস্ত্র সরবরাহ, সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে রিয়াদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে আঞ্চলিক সংঘাতের পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সৌদি আরব বিকল্প সহযোগিতার পথও বিবেচনা করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ইসরাইলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কমে গেলেই সৌদি আরব ইসরাইলের দিকে ঝুঁকবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। রিয়াদকে সামরিক প্রয়োজনের পাশাপাশি কূটনৈতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং অভ্যন্তরীণ জনমতের বিষয়গুলোও বিবেচনা করতে হবে।

পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গেও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। তাই নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় দেশটি শুধু একটি দেশের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখার চেষ্টা করতে পারে।

ফিলিস্তিন প্রশ্নই বড় বাধা

ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছাড়া ইসরাইলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ কঠিন।

অন্যদিকে, ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে মতপার্থক্যের কারণে সমঝোতার পথও সহজ নয়। সৌদি আরবের জন্য মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া ও নিজস্ব জনমতও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

এ কারণে নিরাপত্তার প্রয়োজনে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বা সীমিত সহযোগিতা বাড়লেও তা প্রকাশ্য কূটনৈতিক স্বীকৃতিতে রূপ নিতে সময় লাগতে পারে। এমনকি নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়লেও রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ অনিশ্চিত থেকে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সৌদি আরবকে নতুন কৌশল বিবেচনায় নিতে বাধ্য করতে পারে। তবে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে হুথিদের হুমকি, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, আঞ্চলিক অংশীদারদের সহযোগিতা এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে অগ্রগতির ওপর।

এখন বড় প্রশ্ন হলো, নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়লে সৌদি আরব কি ইসরাইলের সঙ্গে সহযোগিতার পথ বেছে নেবে, নাকি পাকিস্তান, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদ্যমান অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে?