পারমাণবিক যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় ঝুঁকি ভবিষ্যতে মানবজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ মানুষের টিকে থাকা নিয়ে গুরুতর সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা।

মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় আগামী কয়েক দশকে মানুষের অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের ১৭টি ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক সংঘাত, উন্নত প্রযুক্তির অপব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, শিশুদের অপুষ্টি এবং ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার।

গবেষণায় বলা হয়েছে, পারমাণবিক যুদ্ধের মতো বড় সংঘাত ঘটলে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া ও ছাই বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে সূর্যের আলো আটকে দিতে পারে। এতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে বিশ্বজুড়ে দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হবে।

citytouch 728-X-90

অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত বা ক্ষতিকর ব্যবহারও নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে এআইয়ের সহায়তায় বিপজ্জনক জৈব প্রযুক্তির অপব্যবহার হলে তা জনস্বাস্থ্য ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

মানবজাতির জন্য বাড়ছে আরও যেসব ঝুঁকি

পারমাণবিক যুদ্ধ ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের বাইরেও জলবায়ু পরিবর্তনকে অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং খাদ্য ও পানির সংকট মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলতে পারে।

বায়ুদূষণও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। দূষিত বাতাসের কারণে শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শিশুদের অপুষ্টি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার। জীবাণু ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এতে চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে এবং বহু রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

গবেষণায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কমে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও দুর্যোগ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে এসব সংকটের প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।

এখনো কি পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ আছে?

গবেষকেরা মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও পরিস্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

এ জন্য পারমাণবিক সংঘাত প্রতিরোধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।

বিশ্বনেতাদের পাশাপাশি গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন দেশের সরকারের সমন্বিত উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব ঝুঁকির অনেকগুলোই কোনো একটি দেশের পক্ষে এককভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে, ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতির অস্তিত্ব নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হলেও মানুষের বিলুপ্তি অনিবার্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং গবেষণার মূল বার্তা হলো, সম্ভাব্য বিপদগুলো চিহ্নিত করে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বর্তমান বিশ্বের সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।