ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের খবর সামনে এসেছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
জ্ঞানেশ কুমারের কর্মজীবন, রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন কর্মসূচি ঘিরে বিতর্কের কারণে এখন আলোচনায় ভারতের এই শীর্ষ নির্বাচন কর্মকর্তা। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সময়কার কয়েকটি ঘটনাও নতুন করে সামনে এসেছে।
জ্ঞানেশ কুমারের জন্ম ১৯৬৪ সালের ২৭ জানুয়ারি উত্তরপ্রদেশের আগ্রায়। তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৮ সালে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবায় (আইএএস) যোগ দেন। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কেরালাসহ ভারতের একাধিক প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জম্মু ও কাশ্মীরবিষয়ক বিভাগে দায়িত্ব পান।
২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অযোধ্যা-সংক্রান্ত রায়ের পর রাম মন্দির নির্মাণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে গঠিত প্রশাসনিক ব্যবস্থায়ও দায়িত্ব পালন করেন জ্ঞানেশ কুমার। পরবর্তী সময়ে মন্দির নির্মাণের জন্য গঠিত ট্রাস্টের অনুদান ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে। এসব অভিযোগের প্রসঙ্গে তাঁর নাম আলোচনায় এলেও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি এসেছে কেরালার সাবেক মুখ্যসচিব জিজি থমসনের কাছ থেকে। থমসনের দাবি, ২০১৬ সালে দিল্লিগামী একটি বিমানে তাঁদের কথোপকথনের সময় জ্ঞানেশ কুমার তাঁকে বিজেপির হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
থমসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কেরালার পাথানামথিট্টা আসন থেকে বিজেপির প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে তাঁকে উৎসাহিত করা হয়েছিল। নির্বাচনে জয়ী হলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। এই বক্তব্যকে জ্ঞানেশ কুমারের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে বিরোধীদের পক্ষ থেকে সামনে আনা হচ্ছে।
তবে এ ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর রাজনৈতিক পক্ষপাত সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের প্রেক্ষাপট এবং অন্যান্য প্রমাণ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২০০৬ সালের প্রকল্প ঘিরেও বিতর্ক
জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে পুরোনো একটি বিতর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ঘটনাটি ২০০৬ সালের, যখন তিনি কেরালা সরকারের গণপূর্ত বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত কেরালা স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (কেএসটিপি)। প্রকল্পটির আওতায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ভাগীরথা ইঞ্জিনিয়ারিং ও মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠান পিএটিআইয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রায় ২১৬ কোটি রুপির সড়ক উন্নয়নকাজের চুক্তি হয়েছিল।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং রাজ্য সরকারের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তির অর্থ প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানালে তা নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে মতবিরোধ দেখা দেয়।
এ সময় প্রকল্পটির প্রধান ব্যবস্থাপক মালয়েশীয় প্রকৌশলী লি সি বিন আত্মহত্যা করেন। ২০০৬ সালের নভেম্বরে কুয়ালালামপুরে তাঁর মৃত্যুর পর ঘুষ দাবির অভিযোগ সামনে আসে। সে সময় প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর রেখে যাওয়া বলে দাবি করা একটি নোটের বরাত দিয়ে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগের কথা বলা হয়। ওই অভিযোগে জ্ঞানেশ কুমারের নামও উল্লেখ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে।
তবে অভিযোগ ওঠা এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত না করে অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কর্মসূচি। নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়ায় ভোটারদের তথ্য যাচাই করে তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ায় যোগ্য নাগরিকদের ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ভুল বা অনিয়ম হলে এর রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে এবং বিজেপি সুবিধা পেতে পারে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসআইআর প্রক্রিয়ার আওতায় বিভিন্ন পর্যায়ে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়ার তথ্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ভোটার, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত ভোটার এবং প্রায় ৩ কোটি ভোটারকে খুঁজে না পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে খসড়া তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই সব ক্ষেত্রে ভোটাধিকার স্থায়ীভাবে বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় নাম বাদ দেওয়ার কারণ, যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং ভোটারদের আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধীদের মূল উদ্বেগ হলো, এত বড় পরিসরে যাচাইয়ের সময় ভুল হলে প্রকৃত ভোটাররাও তালিকার বাইরে চলে যেতে পারেন।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে অভ্যন্তরীণ আপত্তির দাবি
ভোটার তালিকা সংশোধনের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভোটার তালিকা এবং নির্বাচন পরিচালনার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের দুই ডেপুটি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন।
এই দাবি সত্য হলে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি ও নীতিগত মতপার্থক্য নিয়ে আরও আলোচনার অবকাশ তৈরি হয়। তবে আপত্তিগুলোর প্রকৃতি, সেগুলোর কারণ এবং কমিশনের পক্ষ থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্টভাবে জানা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, প্রশাসনিক কর্মজীবনের পুরোনো অভিযোগ, বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দাবি এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা—সবকিছু মিলিয়ে জ্ঞানেশ কুমার এখন ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, বিরোধীদের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। একই সঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা ভারতের নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।










