কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে মানুষের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। বন্ধুত্ব ও আবেগঘন যোগাযোগের পাশাপাশি অনেকে এআই চ্যাটবটের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়ছেন। তবে এ ধরনের সম্পর্কের সম্ভাব্য সামাজিক ও মানসিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এআইভিত্তিক সঙ্গীসুলভ সেবার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে চীন।

নতুন নীতিমালায় মানুষের মতো আচরণ করতে সক্ষম এবং দীর্ঘমেয়াদি আবেগঘন সম্পর্ক তৈরি করতে পারে—এমন এআই চ্যাটবটের ব্যবহারে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, চীনের কমতে থাকা জন্মহার নিয়েও উদ্বেগ এই নীতির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।


citytouch 728-X-90

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ভার্চ্যুয়াল প্রেমিক-প্রেমিকা, জীবনসঙ্গী বা এ ধরনের অন্তরঙ্গ সম্পর্কভিত্তিক এআই সেবা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের যেকোনো ধরনের এআই চ্যাটবট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও এআই চ্যাটবটকে ব্যবহারকারীকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে এটি মানুষ নয়। একই সঙ্গে ব্যবহারকারী কতক্ষণ ধরে চ্যাটবটের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, সে বিষয়েও নিয়মিত সতর্কবার্তা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় পরপর ব্যবহারকারীকে অনলাইনে কাটানো সময় সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এআইয়ের প্রতি অতিরিক্ত আবেগীয় নির্ভরশীলতা ও আসক্তি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।


নতুন নীতির প্রভাব চীনের প্রযুক্তি খাতেও পড়তে শুরু করেছে। দেশটির কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের এআই সহকারীদের কিছু সঙ্গীসুলভ ফিচার বন্ধ বা সীমিত করেছে। এসব ফিচারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা এআইয়ের সঙ্গে আরও ব্যক্তিগত ও আবেগঘন যোগাযোগের সুযোগ পেতেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এআই সঙ্গীর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ মানুষের একাকিত্ব। বাস্তব জীবনে কথা বলার বা অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার মতো কাউকে না পেলে অনেকেই এআই চ্যাটবটের সঙ্গে যোগাযোগকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এআই ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি অনুভূতির প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে এবং অনেক সময় মানসিক সমর্থনের মতো অভিজ্ঞতাও তৈরি করে।


তবে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাস্তব জীবনে যারা বেশি একাকী বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, তারা এআই চ্যাটবটের ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরশীলতা বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক থেকে মানুষকে আরও দূরে সরিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চীনের নতুন নীতিমালার আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেশটির জনমিতিক পরিস্থিতিকেও দেখছেন বিশ্লেষকরা। কমতে থাকা জন্মহার ও পরিবর্তিত জনসংখ্যা কাঠামোর কারণে চীন বর্তমানে বড় ধরনের জনমিতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তরুণদের একটি অংশ যদি বাস্তব সম্পর্কের পরিবর্তে এআই সঙ্গীর ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে সামাজিক সম্পর্ক ও পরিবার গঠনের প্রবণতায় এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।


ফলে একদিকে একাকিত্বের সময়ে এআই মানুষের জন্য ভার্চ্যুয়াল সঙ্গী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারলেও, অন্যদিকে অতিরিক্ত ব্যবহার বাস্তব সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। চীনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ভবিষ্যৎ এআই নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।